বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রধান বাধা দুর্নীতি—এটি সবাই একবাক্যে স্বীকার করে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক সংস্থা বাংলাদেশের লাগামহীন দুর্নীতি নিয়ে বহুভাবে সতর্ক করে আসছে।কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার—এসব না কমে উল্টো আরো ডালপালা মেলছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৭৪ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা পাচার হয়ে যায়। কিন্তু দুর্নীতি প্রতিরোধে রাষ্ট্র ক্রমাগত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোর ভূমিকাও দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।ফলে একজন সাবেক আইজিপির বিরুদ্ধে, একজন ডিবি হারুনের বিরুদ্ধে, পুলিশের একজন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের বিরুদ্ধে কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা আরো অনেকের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠে। আরো অবাক করা বিষয় হলো, অপকর্মের বহু অভিযোগের পরও তাঁদের অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে গ্রেপ্তার এড়িয়ে যাচ্ছেন। প্রকাশিত খবরে বলা হয়, অঘটনঘটনপটীয়সী হিসেবে পরিচিত পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা ডিবি হারুনের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত শত শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, জমি দখল, নির্যাতন, গুম-অপহরণ, রাজনৈতিক পক্ষপাত, এমনকি নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। জানা যায়, তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলার সংখ্যা ১৮৫। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের ভিত্তিতে আদালত তাঁর অনেক সম্পদ জব্দও করেছেন। তা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত ডিবি হারুন গ্রেপ্তার হননি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই তিনি পলাতক। আইনের শাসনের জন্য এটি ভালো দৃষ্টান্ত নয়।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক মুহাম্মদ নুরুল হুদা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আইন সবার জন্য সমান। দোষী হোক কিংবা নির্দোষ, দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় বাহিনীর সদস্যদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য চলছে বহুমুখী আইনি ও কূটনৈতিক তৎপরতা। জানা গেছে, তাঁকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ চূড়ান্ত করেছে দুদক। জানা যায়, বেনজীরকে ফেরত আনার অনুরোধপত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তা আরব আমিরাত সরকারের কাছে পৌঁছানো হবে। আশা করা যায়, বেনজীর আহমেদকে শিগগিরই দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে। কিন্তু তাঁর ডান হাত বলে পরিচিত পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক গাজী মো. মোজাম্মেল হক এখনো গ্রেপ্তার হননি। তাঁর বিরুদ্ধেও জমি দখল, ক্ষমতার অপব্যবহার, জোরপূর্বক জমি লিখে নেওয়া, নদী ভরাট, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তিনি এখনো দেশেই আছেন এবং সদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ব্যক্তিবিশেষের প্রতি আইনের প্রয়োগ ভিন্ন হলে মানুষ তা থেকে ভিন্ন বার্তাই পায়।
দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ অনেক পুরনো। এসব থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে হবে। আর সে জন্য অপরাধী-নির্বিশেষে কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা গেলে তা অন্যদের সতর্ক করবে, অপরাধ থেকে নিবৃত্ত করবে। পাশাপাশি অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি করার আগেই অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা যায়।

