প্রতিদিনের ডেস্ক:
ইতালির রাজধানী রোমে শিশু কন্যাসহ বাংলাদেশি দম্পতি খুনের ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছে দেশটির পুলিশ। শনাক্তকৃত ব্যক্তির নাম শাহাদাত হোসেন। তার বাড়িও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়। তিনি উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের আবদুল আহাদের ছেলে। ইতালির রোমের পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস এ হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্তের ছবি প্রকাশ করে। প্রসিকিউটর তাদের হটলাইন নম্বর (৩৩৪৬৯০৩২৯৫) দিয়ে বলেছে, কেউ এই অভিযুক্তকে দেখলে তা জানানোর জন্য। ছবি প্রকাশের পর তাকে শনাক্ত করেন নিহতদের এবং শাহাদাতের স্বজন এবং ইতালি প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বাংলাদেশে থাকা নিহতদের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবেশি শাহাদাতের সঙ্গে নিহত দম্পতির আগে থেকে চেনাজানা ছিল। নিহত কামাল ইতালি থাকার সুবাদে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সৃষ্টি হয় শাহাদাতের। তাদের অভিযোগ, এর জের ধরে শাহাদাত এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ইতালি ও বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন তারা।শুক্রবার (২৬ জুন) স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে রোমের পশ্চিমাঞ্চলের অরেলিও এলাকার ভিয়া মন্টিগিও সড়কের পার্কসংলগ্ন এলাকার ফ্ল্যাট থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের চরকাঁকড়া বিজয়নগর এলাকার বাসিন্দা কামাল উদ্দিন বাবুল (৩৯), তাঁর স্ত্রী আরজু (৩৮) এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে আরিশা। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন তাদের ছেলে অয়ন (১৮)। যিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।ইতালির রাজধানীতে শিশু কন্যাসহ বাংলাদেশি দম্পতি খুনের ঘটনায় রোম প্রসিকিউটর কার্যালয় সন্দেহভাজন শাহাদাত হোসেনের ছবি প্রকাশ করে।
নিহত কামালের চাচাত ভাই সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, শাহাদাত চরকাঁকড়া ইউনিয়নের আবদুল আহাদের ছেলে। প্রতিবেশী কামালের পরিবারে এক সময় শাহাদাতের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তখন কামাল একাই ইতালি থাকতেন। তার পরিবার গ্রামের বাড়িতে থাকতেন। এই সময় শাহাদাতের সঙ্গে কামালের স্ত্রী ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এটা নিয়ে তখন এলাকায় বিচার-সালিশও বসে। দুই থেকে তিন বছর আগে কামাল তাঁর স্ত্রী ও পরিবারকে ইতালিতে নিয়ে যায়।সাজ্জাদ মাহমুদ আরো জানান, ২০২৫ সালের কোরবানির ঈদের সময় কামাল স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে দুই মাসের জন্য বাড়িতে আসেন। তখন তার বাড়িতে উড়ো চিঠি আসে। সেই চিঠিতে স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা-পয়সা দাবি করা হয়। আর দাবি পূরণ না হলে গৃহকর্তার ছেলে ও নাতিকে হত্যা এবং কামালের স্ত্রীকে গণধষর্ণের হুমকি দেওয়া হয়। হুমকির মুখে ২৬ দিনের মাথায় ইতালিতে ফিরে যান কামাল ও তার পরিবার। এ ঘটনায় শাহাদাতের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে ধারণা করছে নিহতের পরিবার।কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুল হাকিম উড়ো চিঠির বিষয়ে বলেন, ভুক্তভোগী পরিবার মৌখিকভাবে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছিল। এরপর পুলিশ নিয়মিত টহলের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতের পরিবারের স্বজন অ্যাডভোকেট মো. ইউনুস সুমন বলেন, শাহাদাত প্রায় চার বছর আগে তার স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। সেখানে তার স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়। বছরখানেক আগে তিনি ইতালিতে যান। শাহাদাতের ইতালি যাওয়ার ক্ষেত্রে কামালের স্ত্রী সহযোগিতা করেন বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। ইতালি যাওয়ার পর শাহাদাতকে নিজের বাড়ির আশপাশে না যেতে বলেন কামাল। কিন্তু তিনি কোনো কথা শোনেননি বলে জানান এক স্বজন।নিহত কামালের বাবা সিরাজ আলম বলেন, ‘‘শাহাদাতকে আমরা অনেকবার নিষেধ করেছি। কিন্তু কিছুই শোনেনি। আমার ছেলে তার পরিবার ইতালি নিয়ে যায়। সেখানে গিয়েও শাহাদাত অশান্তি সৃষ্টি করে।’’ তিনি এ হত্যার বিচার চান।ঘটনার পর সন্দেহভাজন শাহাদাত তার ফেসবুক আইডিতে একটি স্ট্যাটাস দেন। ওই স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ‘‘একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে; অন্যকেও মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারও জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।’’ সন্দেহভাজন শাহাদাত হোসেনের চরকাঁকড়া হৃদয়নগর এলাকার বাড়িতে তার মা ও ছোট ভাইয়ের পরিবার রয়েছে। তবে তাদের দাবি, চার বছর ধরে শাহাদাতের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ নেই।শাহাদাতের বড় ভাই সৌদি প্রবাসী ইসমাইল হোসেন বলেন, চার বছর আগে শাহাদাত তার সব সম্পত্তি বিক্রি করে পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে চলে যায়। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাহাদাতের পরিবারের এক সদস্য জানান, নিহত কামালের স্ত্রী আরজুর সঙ্গে শাহাদাতের পরকীয়ার সম্পর্ক ছিল। শাহাদাতেরও স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে। আরজু যখন দেশে থাকতেন তখন শাহাদাতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দুই পরিবারে একাধিকবার সালিশও হয়। কিন্তু শাহাদাত বা আরজু কেউই সংশোধন হয়নি। এরপর কামাল তার পরিবারকে ইতালি নিয়ে যায়। তারপরও আরজুর সঙ্গে শাহাদাতের যোগাযোগ ছিল। এক সময় শাহাদাতও তার সব সম্পত্তি বিক্রি করে যুক্তরাজ্য পাড়ি জমায়। সেখানে গেলে স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়। এরপর শাহাদাত ইতালি চলে যায়। সেখানে গিয়ে আবার আরজুর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে।
