বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

ড. হারুন রশীদ
বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এ দেশের দক্ষিণে বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর কেবল একটি জলরাশি নয়, বরং সম্ভাবনার এক বিশাল ভাণ্ডার। বহু বছর ধরে আমাদের অর্থনৈতিক আলোচনায় কৃষি, তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয় কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি স্থান পেলেও সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি বা নীল অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে আড়ালেই ছিল। অথচ সমুদ্রই হতে পারে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রায় এক লাখ আঠারো হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্রাঞ্চলের ওপর সার্বভৌম অধিকার অর্জন করে। সেই বিজয়ের এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সমুদ্রসম্পদ আহরণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। মাছ, লবণ এবং সীমিত কিছু সামুদ্রিক সম্পদ ছাড়া বঙ্গোপসাগরের বিশাল সম্ভাবনা আজও অনেকাংশে অনাবিষ্কৃত।
এ বাস্তবতায় সরকার সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরের অফশোর ব্লকগুলোতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। নতুন উৎপাদন-বণ্টন চুক্তিতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে গ্যাসের মূল্য, ব্যয় পুনরুদ্ধার, তথ্যপ্রাপ্তি এবং বিনিয়োগ কাঠামোয় একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। সরকার মনে করছে, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে এবার বিদেশি বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই উদ্যোগ কি সত্যিই বাংলাদেশের নীল অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, নাকি এটি কেবল আরেকটি আশাবাদের গল্প হয়ে থাকবে?
বিশ্ব অর্থনীতিতে নীল অর্থনীতি এখন আর নতুন কোনো ধারণা নয়। সমুদ্রভিত্তিক পরিবহন, মৎস্যসম্পদ, সামুদ্রিক পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গভীর সমুদ্রের খনিজ সম্পদ, জৈবপ্রযুক্তি এবং অফশোর তেল-গ্যাস—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক নীল অর্থনীতির আকার কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই খাত আগামী দশকগুলোতে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের জন্য এই সম্ভাবনা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের স্থলভাগের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমেই কমছে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গ্যাসের চাহিদা বাড়লেও দেশীয় উৎপাদন সেই চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। ফলে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এই বাস্তবতায় বঙ্গোপসাগরে উল্লেখযোগ্য গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবতার কথাও বলতে হবে।
সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মকাণ্ডগুলোর একটি। একটি গভীর সমুদ্র কূপ খননে শত শত মিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। অনুসন্ধানে সফলতার নিশ্চয়তাও থাকে না। এ কারণেই বিশ্বের অধিকাংশ দেশ আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোর প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে।
বাংলাদেশও সেই পথেই হাঁটছে। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে—বিনিয়োগ আকর্ষণের নামে জাতীয় স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে?
নতুন উৎপাদন-বণ্টন চুক্তিতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। সরকারের যুক্তি, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে বাস্তবসম্মত ও প্রতিযোগিতামূলক শর্ত দিতে হবে। অন্যদিকে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া হলে ভবিষ্যতে জাতীয় সম্পদ থেকে জনগণের প্রাপ্য আয় কমে যেতে পারে। অর্থাৎ বিনিয়োগ প্রয়োজন, কিন্তু সেই বিনিয়োগের শর্ত হতে হবে স্বচ্ছ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশ্বে এ বিষয়ে সফলতার বহু উদাহরণ রয়েছে।
নরওয়ে উত্তর সাগরের তেল-গ্যাস সম্পদকে কেবল উত্তোলনই করেনি; দক্ষ নীতিনির্ধারণ, কঠোর নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা বিবেচনায় রেখে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সার্বভৌম সম্পদ তহবিল গড়ে তুলেছে। বিপরীতে আফ্রিকার কয়েকটি সম্পদসমৃদ্ধ দেশ দুর্বল শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতি ও নীতিগত ব্যর্থতার কারণে তথাকথিত ‘সম্পদের অভিশাপ’-এর শিকার হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সংঘাত ও দারিদ্র্য কমেনি।
বাংলাদেশ কোন পথ বেছে নেবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীল অর্থনীতি মানেই কেবল তেল-গ্যাস নয়। বরং এটি একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক দর্শন।
বঙ্গোপসাগরে রয়েছে সামুদ্রিক শৈবাল, গভীর সমুদ্রের খনিজ, সামুদ্রিক ওষুধ তৈরির সম্ভাবনা, সামুদ্রিক জৈবপ্রযুক্তি, অফশোর নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, সমুদ্রভিত্তিক পর্যটন এবং উন্নত মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিশাল সুযোগ। যদি রাষ্ট্রের সমুদ্রনীতি কেবল তেল-গ্যাসকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে নীল অর্থনীতির প্রকৃত সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে না।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণা, সমুদ্রতল জরিপ, তথ্যভান্ডার, বিশেষজ্ঞ জনবল এবং আধুনিক গবেষণা অবকাঠামো এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ফলে আন্তর্জাতিক কোম্পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে এবং আলোচনায় দেশের দর-কষাকষির সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ে।
এ কারণেই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, আধুনিক সিসমিক জরিপ, সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণায় বিনিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা উন্নয়ন এবং দেশীয় বিশেষজ্ঞ তৈরির দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ধীরে ধীরে অফশোর কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী করে তুলতে হবে।
আরেকটি বিষয় কখনোই উপেক্ষা করা যাবে না—পরিবেশ।
বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদ, উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য এবং কোটি মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে পরিবেশগত ঝুঁকি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভয়াবহ ক্ষতির নজির রয়েছে। ফলে যেকোনো অনুসন্ধান ও উত্তোলনের আগে আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশগত মূল্যায়ন, জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিরাপত্তা—দুটিকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে।
এখানে আরেকটি কৌশলগত বাস্তবতাও রয়েছে। বিশ্ব দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে। সৌর, বায়ু ও সবুজ হাইড্রোজেনের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে আগামী কয়েক দশকে জীবাশ্ম জ্বালানির বাজার ও মূল্য কাঠামোয় পরিবর্তন আসতে পারে। তাই বাংলাদেশ যদি অফশোর সম্পদ উন্নয়নে এগোয়, তবে সেটি হতে হবে সময়োপযোগী, দ্রুত এবং অর্থনৈতিকভাবে বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে।
অর্থাৎ, একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির রূপান্তরও অব্যাহত রাখতে হবে। এই দুই লক্ষ্যকে সমন্বয় করেই ভবিষ্যতের জ্বালানি নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সুশাসন।
অফশোর চুক্তি, বিনিয়োগ, উৎপাদন, রাজস্ব বণ্টন, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং আর্থিক লেনদেন—সবকিছুতেই সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সংসদীয় তদারকি, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, জনস্বার্থে তথ্যপ্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুসরণ ছাড়া এত বড় জাতীয় সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
সমুদ্র আমাদের জন্য কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয়; এটি হতে পারে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার নতুন ভিত্তি। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে আমাদের নীতির প্রজ্ঞা, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সুশাসনের ওপর।
বঙ্গোপসাগরের গভীরে হয়তো বিপুল তেল-গ্যাসের ভাণ্ডার রয়েছে, আবার নাও থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত—সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষতা ও দূরদর্শিতা গড়ে তুলতে পারলে নীল অর্থনীতি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু সম্পদ আহরণ নয়, সম্পদের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী, টেকসই, জ্ঞানভিত্তিক এবং প্রজন্মবান্ধব অর্থনীতি নির্মাণ। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রাকৃতিক সম্পদ কোনো দেশের ভাগ্য বদলায় না; ভাগ্য বদলায় সেই রাষ্ট্রের প্রজ্ঞা, সুশাসন এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়