সেই পুরোনো উদ্যম!

প্রতিদিনের ডেস্ক:
মেসি আর নেই সেই মেসি। ৩৯ বছর বয়সে ২৩ বছর বয়সী মেসিকে খুঁজে পাওয়া দুস্কর হওয়াটাই তো যৌক্তিক। এরপরও যেই খেলোয়াড়ের নামের আগে জাদুকর তকমা লেগে আছে, তাকে তো আর ফুরিয়ে গেছে বলার জো নেই। এই বয়সে আর্জেন্টাইন তারকা যা করছেন, তাতে মাঝেমধ্যেই ফিরে আসছে পুরোনো দিনের সেই উদ্যম। এখনও আগের মতোই তার অর্জনের ক্ষুধা। ২০২২ আসরে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে নিজের দ্বিতীয় গোলের উদযাপনের মতোই মিশরের বিপক্ষে সমতা ফিরিয়ে বাঁধভাঙা যে উল্লাস তিনি করেছেন সেটি হয়তো ভক্তদেরও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়েছে। মনে করিয়ে দিয়েছে লুসাইলের ফাইনালের সেই উদযাপনের কথাও।
লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই রোমাঞ্চকর রাতে ফুটবল তার ঋণ শোধ করে দিয়েছে লিওনেল মেসির। অপ্রাপ্তির খাতায় বাকি নেই আর কিছুই। এরপরও নতুন আরেক স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে আর্জেন্টিনা দলকে নেতৃত্ব দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছেন তিনি। কেবল দিকনির্দেশনা মূলক নেতৃত্ব নয়। মাঠের খেলায়ও তিনি বাকি সবার চেয়ে এগিয়ে। ইতোমধ্যেই করেছেন ৮ গোল। এককভাবে গোল্ডেন বুটের দৌঁড়ে আছেন এগিয়ে।মেসি আর নেই সেই মেসি বলা সমালোচকটাও মানেন যে, আর্জেন্টিনা দলের সব তরুণও এখনও অনেকখানি পিছিয়ে তারচেয়েও। অন্তত মিশরের বিপক্ষে মেসির গোল-অ্যাসিস্টের পর তো সব সমালোকেরই মুখ তালাবদ্ধ হয়েছে নিশ্চিতভাবেই। বিশ্বকাপের মৌসুমে এক ম্যাচের উন্মাদনা বেশিদিন স্থায়ী হয় না। সেই হিসাবে সেই ম্যাচের উন্মাদনাও থাকার কথা হয়। কিন্তু এরপরও সেই ম্যাচের আমেজ এখনও কেন বিদ্যমান? উত্তরটা সহজ- যে ম্যাচে মেসি পারফর্ম করেন সেই ম্যাচের রেশ রয়ে যায় বহুকাল ধরে। যেমনটা লুসাইলের ফাইনাল এখনও জীবিত। সেটি কেবল মেসি বা আর্জেন্টিনা ভক্তদের হৃদয়ে নয়, সমগ্র ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়েই। ইতিহাসের সেরা ফাইনালের হিসেবেও রয়েছে জনশ্রুতি। সেই ফাইনালে লুসাইলের মাঠের এক উদ্যম ফিরেছে চলমান বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচেও।মিশরের বিপক্ষে ৮৪ মিনিটে মেসি যখন গোল করলেন, পুরো গ্যালারি যেন কেঁপে ওঠে আকাশী-নীলের গর্জনে। পিছিয়ে পড়া আর্জেন্টিনাকে ২-২ সমতায় ফিরিয়ে আবারও স্বপ্ন দেখালেন দলের সবচেয়ে বড় তারকাই। উচ্ছ্বাস বা উল্লাস কেবল গ্যালারিতেই নয়। স্বয়ং গোল করা মেসিও দেখালেন কীভাবে বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে উঠতে হয়।
লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পাস থেকে পাওয়া বল জোরালো শটে জালে জড়ান মিশরের গোলরক্ষককে পরাস্ত করে। এরপর মেসি ছুটলেন কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে তীব্র গতিতে। সেখানে পৌঁছানোর আগমুহূর্তে দুইবার লাফ দিয়ে শূন্যে হাত ছড়ালেন। আবেগের তীব্র বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় ৩৯ বছর বয়সী মেসির কাছ থেকে। এতটাই গতিতে দৌড়ে তিনি উদযাপন করেছেন যে, পেছনে থাকা ২৫ ও ২৬ বছর বয়সী সতীর্থ এনজো ফার্নান্দেজ ও হুলিয়ান আলভারেজও তার নাগাল পাচ্ছিলেন না। মেসি নিজেই দৌড় থামিয়ে দুই সতীর্থকে জাপটে ধরে করলেন সমতা ফেরানোর আনন্দ।যে আনন্দ একেবারে কাতারের টানটান উত্তেজনার ফাইনালে নিজের করা দ্বিতীয় গোলের উদযাপনের সঙ্গে অনেকাংশেই মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ২-২ সমতায় থাকা ফাইনালের ১০৮ মিনিটে এনজো ও লাউতারোর সঙ্গে বল দেওয়া-নেওয়া করে ফ্রান্সের বক্সে ঢুকে যান আর্জেন্টিনার এই ত্রয়ী। গোলের জন্য লাউতারো জোরালো শট নিলেও ঠেকিয়ে দেন ফ্রান্সের গোলকিপার হুগো লরিস। বল চলে আসে মেসির নাগালে। আলতো করে ছুঁয়ে গোল করেন মেসি। প্রথমে অনিশ্চয়তা থাকলেও মুহূর্তেই গোলের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন রেফারি। তাতে ৩-২ গোলে ফাইনালে লিড নেয় আর্জেন্টিনা।
এরপর মেসির সেদিনের উল্লাসটা মনে করে দেখুন। টানটান উত্তেজনার ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নিয়ে মেসির আনন্দের ছিল না কোনো সীমা। আবেগের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে মেসি চালিয়ে যান উদযাপন পুরোদমে। মাঠের ও ডাগআউটের সতীর্থরা তাকে ঘিরে ধরেন। আনন্দে মেসিকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খান আর্জেন্টিনার সব শিরোপা জয়ের ফাইনালে গোল করা আনহেল ডি মারিয়া। সবাই সরে যাওয়ার পরও থামেনি আর্জেন্টাইন মহাতারকার উল্লাস। দর্শকসারির দিকে একাধিকবার হাত ঘুরিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে মেসি আজন্ম লালিত স্বপ্ন পরম আরাধ্য সোনালি ট্রফির স্বাদ পেতে শুরু করেন।যদিও ওই গোলের পর কিলিয়ান এমবাপে পেনাল্টি থেকে গোল করে সমতা ফিরিয়ে আনেন। তবে সেই সমতা আর্জেন্টিনার তৃতীয় শিরোপা জয়ে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। টাইব্রেকারে এমিলিয়ানো মার্তিনেজের দৃঢ়তায় ৪-২ ব্যবধানে চ্যাম্পিয়ন হয় মেসির আর্জেন্টিনা।
মিশরের বিপক্ষে সমতা ফেরানো গোলের পর সেই একই উদ্যমের উদযাপনটাই দেখা গেছে আর্জেন্টিনা গ্রেটের কাছে। তিনি হাসলে হাসে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আলবিসেলেস্তেদের পুরো সমর্থকগোষ্ঠী। স্বপ্ন পূরণের ফাইনালের উদযাপনটা ফিরিয়ে এনে মেসি নিশ্চিতভাবেই আবারও স্বপ্ন দেখার ইঙ্গিতটাই দিলেন সমর্থকদের।একদম যেন সেই পুরোনো উদ্যমে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়