কামরুজ্জামান মুকুল, বাগেরহাট
সুন্দরবনে কুমিরের গতিবিধি ও আয়ুষ্কাল জানতে গবেষণা শুরু হয়েছে। গবেষণার জন্য শরীরে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার লাগিয়ে চারটি কুমির সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। এক মাস আগে অবমুক্ত করা কুমির চারটি এখন সুন্দরবনে অবস্থান করছে। গেল এক মাস ধরে তিনটি কুমির সুন্দরবনের বিশাল এলাকায় অবস্থান করলেও, একটি কুমির সুন্দরবনের বিশাল এলাকা ছেড়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছে। সব শেষ ১২ এপ্রিল রাতে চিতলমারী উপজেলার কলাতলা ইউনিয়নের দক্ষিণ শৈলদাহ গ্রামের একটি মৎস্য ঘের থেকে কুমিরটি উদ্ধার করে সুন্দরবনে অবমুক্ত করেছে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ।আইইউসিএন ও বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৩ মার্চ থেকে ১৬ মার্চের মধ্যে চারটি লোনা পানির কুমিরের শরীরে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার বসিয়ে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে চারটি স্থানে অবমুক্ত করা হয়। এর মধ্যে দুটি পুরুষ ও দুটি স্ত্রী কুমির রয়েছে। অবমুক্ত করা স্ত্রী কুমির দুটোর মধ্যে একটি সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের কুমির জুলিয়েট এবং যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাগরদাড়ি এলাকার মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ির এলাকা থেকে ২০২২ সালে উদ্ধার করা কুমির যার নাম মধু। এছাড়া পুরুষ কুমির দুটোর মধ্যে একটি মাদারীপুর থেকে উদ্ধার করা এবং অন্যটি সুন্দরবনের হাড়বাড়িয়া এলাকায় ফাঁদ পেতে ধরা। অন্য তিনটি কুমির সুন্দরবনের বিশাল এলাকায় বিচরণ করলেও, মাদারীপুর থেকে উদ্ধার করা পুরুষ কুমিরটি বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। গবেষণায় যুক্ত করা চারটি কুমিরের মধ্যে স্ত্রী কুমির দুটির নাম দেওয়া হলেও, পুরুষ কুমির দুটির নাম দেওয়া হয়নি বলে জানান করমজল বন্য পাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজাদ কবির। জার্মান ফেডারেল মিনিস্ট্রি ফর ইকনোমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (জিআইজেড) সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) এবং বন বিভাগ যৌথভাবে এই গবেষণা কাজ করছে। এই গবেষণায় অস্ট্রেলিয়ার কুমির গবেষক ড. সামারাভিরা ও পল বেরি মূল গবেষকের ভূমিকা পালন করছেন। এক বছর ধরে চলবে এই গবেষণা।
বন বিভাগ বলছে, সুন্দরবনের জন্য কুমির খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাণী। কিন্তু কুমিরের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছিল। যার কারণে ২০০০ সালে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের করমজল এলাকায় কুমির প্রজনন কেন্দ্র করা হয়। এখানে নিয়মিত কুমিরের প্রজনন হয়। কুমির বাচ্চা দেয়, যা বিভিন্ন সময় সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। এ পর্যন্ত করমজলে জন্ম নেওয়া দুই শতাধিক কুমির সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে অবমুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু অবমুক্ত করা কুমিরগুলো কতদিন বেঁচে ছিল, বা সুন্দরবনে ছিল কিনা সে বিষয়ে কিছুই জানা যায়নি। সুন্দরবনের কুমির কোথায়, কীভাবে বিচরণ করে তা নিয়ে বিস্তারিত কোনো গবেষণা হয়নি। যার কারণে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার যুক্ত করে সুন্দরবনে কুমির অবমুক্ত করা হয়েছে।
আইইউসিএন বলছে, বিশ্বে পাখি, কচ্ছপ, নেকড়েসহ বিভিন্ন প্রাণীর শরীরে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার বসিয়ে তাদের আচরণ নিয়ে গবেষণার নজীর রয়েছে। তবে বাংলাদেশে কুমির নিয়ে এভাবে গবেষণা এই প্রথম করা হচ্ছে। কুমির গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকা সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজাদ কবির বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় লবণ পানিযুক্ত নদীতে একসময় কুমির দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে শুধু সুন্দরবনেই কুমির দেখা যায়। তবে এই পরিবেশে লোনা পানির কুমিরের এই প্রজাতির প্রজনন খুব একটা হচ্ছে না। আইইউসিএন ২০১৫ সালে কুমিরকে বাংলাদেশে রেড লিস্টেট (বিপন্ন প্রাণী) করে। যার কারণে কুমির নিয়ে গবেষণা শুরু করা হয়েছে। বন কর্মকর্তা আজাদ কবির বলেন, কুমিরের মাথার ওপরের অংশে আঁশের মতো একটি আবরণ থাকে। ওই স্যাটেলাইট ট্যাগটি বসানোর জন্য সেখানে ছোট একটা ছিদ্র করতে হয়। ওই ছিদ্রের মধ্যেই বসানো হয় এই স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটারটি। একাজের জন্য প্রথমে কুমিরকে ধরা হয়। এরপরে বিশেষ প্রক্রিয়ায় কুমিরের মাথার উপরের অংশে ছিদ্র করে ট্রান্সমিটারটি বসানো হয়। আইইউসিএনের ম্যানেজার ও প্রকল্পের সমন্বয়কারী সারোয়ার আলম দীপু বলেন, এই কিটটির মেয়াদ এক বছর হলেও, এটি চাইলে আরও বাড়ানো যাবে। এই ট্রান্সমিটার চিপটি খুব হালকা। যার ওজন দুই গ্রামেরও কম। এই ধরনের চিপ বসানো হলে তাতে কুমিরের কোনো ক্ষতি হয় না। এক মাসে এই গবেষণায় কি ধরনের তথ্য উপাত্ত পাওয়া গেছে এমন প্রশ্নে সারোয়ার আলম দীপু বলেন, গবেষণা মাত্র শুরু হলো। এ সময়ে আমরা একটা বিষয় বুঝেছি, কুমিরের বাসস্থান ও খাবার পছন্দ না হলে সে বিভিন্ন স্থানে যেতে পারে। তবে কুমির বিষয়ে জানতে হলে আরও দীর্ঘ গবেষণা প্রয়োজন। এক বছর মেয়াদের এই গবেষণা শেষে আমরা হয়ত একটা গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল দিতে পারব। খুলনার বন সংরক্ষক মিহির কুমার দে বলেন, সুন্দরবনে নানা প্রজাতির প্রাণী আছে। বিভিন্ন প্রাণী নিয়ে গবেষণা হলেও এবারই প্রথম কুমির নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কুমিরের প্রজনন, অবস্থান, বাসস্থান ও আয়ুষ্কাল সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যাবে বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।
