প্রতিদিনের ডেস্ক॥
সিলেটের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনার মোহাম্মদ এনামুল হককে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আদেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার (৮ জুলাই) ঢাকা দায়রা জজ মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন। দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম এ তথ্য জানিয়েছেন। এর আগে গত ৪ জুলাই এনামুলের ৮ কোটি ৯৫ লাখ ৪ হাজার ৫০০ টাকার জমি ও ফ্ল্যাট জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ওইদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক ফারজানা ইয়াসমিন সম্পত্তি ক্রোকের আবেদন করেন। ওই আবেদনে বলা হয়, ৯ কোটি ৭৬ লাখ ৯৭ হাজার ১০৭ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে এনামুল হকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন মামলা দায়ের করে।
তদন্তকালে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, আসামি তার মালিকানাধীন ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন। যা করতে পারলে এ মামলার ধারাবাহিকতায় আদালতে চার্জশিট দাখিল, আদালতের বিচার শেষে সাজার অংশ হিসেবে অপরাধলব্ধ আয় থেকে অর্জিত সম্পত্তি সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করাসহ সব উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। তাই মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট দাখিলের পর আদালতের বিচার শেষে সরকারের অনুকূলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের সুবিধার্থে তথা সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে তার স্থাবর সম্পত্তি জব্দ করা প্রয়োজন। জব্দকৃত সম্পত্তির মধ্যে গুলশানের জোয়ার সাহারায় ৬১ লাখ টাকার তিন কাঠা জমি, খিলক্ষেত্রে ৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকার ৩৩ শতাংশ জমি, কাকরাইলের আইরিশ নূরজাহানে কমনস্পেসসহ ১১৭০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, যার মূল্য ২৮ লাখ ৩০ হাজার ৫০০ টাকা, একই ভবনে কারপার্কি স্পেসহ ১৮৩৫ বর্গফুট ফ্ল্যাট। এর মূল্য ৫১ লাখ ২৯০০ হাজার টাকা। এছাড়া কাকরাইলে ১৯০০ বর্গফুট ও ৩৮০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটসহ কারপার্কিং রয়েছে যার মূল্য ২ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। গাজীপুরে ৬২ লাখ ৪০ হাজার টাকার পাচ কাঠা জমি। মোহাম্মদপুরে তিনটি বাণিজ্যিক ভবনে চার হাজার বর্গফুটের তিনটি স্পেস। যার প্রতিটির মূল্য ৭১ লাখ ৩৫ হাজার করে। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরে ১০ হাজার ৯৬৫ বর্গফুটের স্পেস রয়েছে যার মূল্য দুই কোটি ৩৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এছাড়া গুলশানের ৭২ লাখ টাকার ২৪২৮ বর্গফুটের ফ্ল্যাট এবং বাড্ডায় চার কাঠা নাল জমি যার মূল্য ১৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। এদিকে সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, কমিশনার এনামুল ঢাকায় থাকলেও গ্রামে সোনাগাজী পৌরসভার জমির ওপর রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে করা চারটি নতুন ভবন। পৌরসভার বাড়িতে তার চার ভাইয়ের জন্য চারটি ঘর নির্মাণের জন্য ৪০ শতক রেখে বাকি ২০০ শতক জমি তার আয়ত্তে রয়েছে। এই সম্পদের বাজার মূল্য রয়েছে ১০ কোটি টাকা। সম্প্রতি নির্মাণ করা ভবনগুলোর বর্তমান বাজার মূল্য আট কোটি টাকার ওপরে। এছাড়াও পৌরসভার ছয় নং ওয়ার্ডের জারা কমিউনিটি সেন্টারের পূর্ব পাশে রয়েছে ৬০ শতক জমি, যার মূল্য তিন কোটি টাকা। সেই সঙ্গে মুহুরি প্রজেক্টে পৃথক দুই স্থানে ২০ একর জমিসহ একটি ডুপ্লেক্স বাংলো বাড়ি এবং মৎস্য-গরু খামার রয়েছে। কাস্টমস কর্মকর্তার পৈতৃক নিবাস ছাড়াইতকান্দিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একটি জরাজীর্ণ ঘর রয়েছে। তার চাচা নুরুল হক প্রকাশ লাতু মিয়া বলেন, আমাদের এই বাড়ি ১৬০ শতক জায়গার ওপরে এবং হাটার রাস্তা (গাড়া) রয়েছে ৩০ শতক। হিসেব অনুযায়ী উভয়পক্ষ অর্ধেক করে মালিক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে তারা ১০ আনা ভোগ দখলে রেখেছে। আরও আমার দখলে আছে ৬ আনা। অর্থাৎ এই বাড়িটিতে ১৬০ শতক জায়গার মধ্যে ১০০ শতক জায়গা কাস্টমস কর্মকর্তার রয়েছে। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, সম্পত্তি নিয়ে তার চাচার সঙ্গে বিরোধ রয়েছে। স্থানীয়রা জানায়, সোনাগাজীতে এনামুলের সম্পদ দেখাশোনা করেন তার ভগ্নিপতি মো. শরীফ হোসেন। দুই বছর আগে বিয়েতে শরীফকে তিনি টয়োটা এস্কোয়ারন গাড়ি উপহার দেন। যার মূল্য ৩০ লাখ টাকারও বেশি। কাস্টমস কর্মকর্তা এনামুলের মামা এবং সোনাগাজী উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম জানান, এনামুল হক আমার ফুফাতো বোনের ছেলে। সে বড় মাপের কর্মকর্তা হলেও তার আচার-আচরণ খুবই বাজে এবং সে দুর্নীতিবাজ লোক। একটি ঘটনায় তার তিন কোটি টাকা লেনদেনের সাক্ষী আমি হয়েছিলাম। প্রথমে সে নিজে একজন ভালো মানুষ দাবি করে টাকা নিতে না চাইলেও পরে আরেকটি মাধ্যমে একই টাকা সে গ্রহণ করে ফাইলটি সাক্ষর করে। তিনি আরও বলেন, মুহুরি প্রজেক্টে আমার প্রকল্পের পাশেই তার দুটো প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে একটি ছয় একর, গত ১৫ দিন আগে পিলার এবং তারকাটা দিয়ে জোর করে দখলে নিতে প্রায় আধা কিলোমিটার রাস্তার পাশের ৫০০ গাছ সে কেটে ফেলেছে। সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জায়গা থাকলেও তার ক্ষমতায় তারা নিশ্চুপ আছে। এই জায়গায় সে মৎস্য এবং গরুর খামার করেছে। অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে জানতে মোহাম্মদ এনামুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তার ভগ্নিপতি শরীফ হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

