২৩শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

বছরে কোটি টাকা আয় : বেনাপোল রেল স্টেশনের সুযোগ-সুবিধা না বাড়লেও বাড়ছে যাত্রী দুর্ভোগ

সুন্দর সাহা
যশোরের বেনাপোল রেল স্টেশনটিতে আজও লাগেনি আধুনিকতার ছোঁয়া। মালামাল ও যাত্রী পরিবহনে বছরে প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা আয় হয় এই স্টেশনে। সুযোগ-সুবিধা না বাড়লেও বাড়ছে যাত্রী দুর্ভোগ। ডিজিটাল যুগেও আধুনিকতার ছোঁয়া প্রয়োজন থাকলেও তার কোন বালাই নেই এ স্টেশনে, এছাড়া দীর্ঘদিনের জনবল সংকট রয়েছে এ স্টেশন। যা আছে তা দিয়ে কোন কাজে আসে না। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৫ সালে পাক ভারত যুদ্ধের আগে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ চালু ছিল। যুদ্ধকালীন ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করে কিছু দিনের জন্য এই পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

পরে আবারও চালু হয়। কিন্তুু ১৯৭৪ সালে লোকসানের কবলে পড়ে রেল চলাচল একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এর পর বেনাপোল যশোরসহ গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ পুনরায় রেল পথটি চালু করার জন্য সরকারের নিকট দাবি জানিয়ে আসছিল। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বেনাপোল-খুলনা ভায়া যশোরের সাথে যাত্রীবাহী ট্রেন চালু করে। ১৯৯৯ সালে বেনাপোল দিয়ে ভারত বাংলাদেশের মধ্যে ট্রেনে আমদানি বাণিজ্য শুরু হয়। এর পর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দু’দেশের প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর গত ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল পরীক্ষামূলক চালু করা হয় কলকাতা-খুলনা ভায়া বেনাপোলের মধ্যে ‘বন্ধন একপ্রেস’ নামের যাত্রীবাহী ট্রেনটি।

পরে একই সালের ১৬ নভেম্বর থেকে কলকাতা-খুলনার মধ্যে যাত্রীবাহী ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’ বাণিজ্যিক ভাবে যাত্রা শুরু করে। ভারতগামী যাত্রীসহ এই অঞ্চলের যাত্রীদের সুবিধার কথা চিন্ত করে ২০১৯ সালের ১৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেনাপোল-ঢাকা রুটে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনের উদ্বোধন করেন। বেনাপোল স্টেশন থেকে সপ্তাহে দুইটি ট্রেন খুলনা-কলকাতা (বন্ধন এক্সপ্রেস), প্রতিদিন দুইটি লোকাল ট্রেন বেনাপোল কম্পিউটার (বেতনা এক্সপ্রেস) বেনাপোল-খুলনা ও সপ্তাহে ৬দিন দুপুর একটায় একটি আন্তঃনগর ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ বেনাপোল-ঢাকার মধ্যে চলাচল করে থাকে। যাত্রীরা যশোর খুলনা ও ঢাকায় যেতে বাসের চেয়ে ট্রেনের ভাড়া অনেক কম বলে ট্রেন যাত্রাকে অনেকটা পছন্দ করেন। বেনাপোল রেল স্টেশনে চলছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কার্যক্রম, গণ শৌচাগারের অভাব, যাত্রী বিশ্রামাগার অপরিচ্ছন্ন, বিদ্যুৎ চলে গেলে ভুতুড়ে এলাকায় পরিণত, টোপলাটানা পাটির উপদ্রুপ, বিশুদ্ধ পানির অভাব, এছাড়া গরু ছাগলের বিরাণভূমি এ স্টেশন মাঠ এলাকা। কেউ নেই এসব দেখার।

সবাই রয়েছে নিজ নিজ ধান্দায়। যাত্রীদের অভিযোগ এখানে উন্নতমানের গণ শৌচাগার না থাকায় মহিলা যাত্রীদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। এখানে একটি প্রথম শ্রেণীর ওয়েটিং রুম থাকার কথা থাকলেও তা নেই। এক জন সুইপার কাগজ-কলমে থাকলেও তাদের কাজে দেখা যায় না। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বালাই নেই, খাবার পানির জন্য একটি টিউবয়েল ছিল তা উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন স্টেশনে কোন টিউবয়েল নেই। যাত্রীরা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে পানির জন্য। রেলওয়ে স্টেশনে মেডিকেলের কোন কার্যক্রম নেই। ফলে ট্রেনে কাটা রোগী, সাধারন যাত্রী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়াও রেল স্টেশনের প্রবেশ মুখে ও এ সড়কে যততত্র ইজিবাইক ও ভ্যান রেখে প্রতিনিয়ত যানজটের সৃষ্টি করা হচ্ছে। সাধারন যাত্রীরা এদের অত্যাচারে হাটতেও পারে না। ইজিবাইকে যাত্রী উঠানোর ও নামানোর জন্য কোন এটা সর্বত্র যানবাহন রেখে দেয়। স্থানীয়রা জানান, বর্ষা মৌসুমে স্টেশনের প্রথম প্ল্যাটফর্মের চাল দিয়ে বৃষ্টি পড়ে। এতে যাত্রীরা দুর্ভোগ পড়েন। হাঁটু সমান পানি জমে থাকে দেখার কেউ নেই, যাত্রীরা হাঁটতে পারে না, জুতা স্যান্ডেল হাতে নিয়ে ট্রেনে উঠতে হয়। অধিকাংশ যাত্রীরা বিনা টিকিটে ভ্রমণ করে। ভারতীয় পণ্য চোরাচালানী হয় এসব ট্রেনে। ট্রেনের বসার সিট চোরাচালানী পণ্য রাখা হয়। এক শ্রেনীর মহিলা চোরাচালানীদের নিজস্ব সম্পদে পরিনত হয়েছে এসব ট্রেন।

প্রতিবাদ করলে চোরাচালানীরা একজোট হয়ে যাত্রীদের উপর মারমূখী হয়ে ওঠে। চক্ষু লজ্জার ও মান সম্মানের ভয়েতে কোন যাত্রী প্রতিবাদ করার সাহস পান না। রেল পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনী থাকলেও তাদের দেখা যায় প্রকাশ্যে চোরাচালানীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের সহযোগিতা করতে। ট্রেনের মধ্যে রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) থাকলেও তারা একটি বগিতে সিট নিয়ে ঘুমাতে ঘুমাতে আসলেও যাওয়ার সময় চোরাচালানীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতে দেখা যায়। বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনের (বেনাপোল-ঢাকা) অপেক্ষমান যাত্রী সিদ্দিকুর রহমান জানান, আমি ঢাকা যাব অনলাইনে টিকিট কাটতে হবে। সব সময় অনলাইনে টিকিট পাওয়া যায় না। সমস্যায় পড়তে হয়। বগি বৃদ্ধি করলে এ সমস্যা থাকবে না। সেই সঙ্গে রয়েছে নেশাখোরদের উৎপাত। শুধু তাই নয় বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে স্টেশন যাত্রীদের মূল্যবান কাগজপত্র নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়ে। বেনাপোলের যাত্রী আনোয়ারুল ইসলাম জানান, চোরাকারবারীদের দৌরাত্ম এত বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে যে, স্টেশনে বিজিবি ও চোরাকারবারীরা অবৈধ্য মালামাল নিয়ে খেলার মত দৌড়াদৌড়ি করে। জিআরপি পুলিশ সাধারণ লোকজনকে নিরাপত্তা না দিয়ে চোরাকারবারীদের কাছ থেকে টাকা কালেকশনে ব্যস্ত থাকেন।

রেলের যাত্রী নিরাপত্তা ও চোরকারবারীদের প্রতিরোধের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব রেল পুলিশের। রেল পুলিশ এসব দায়দায়িত্ব পালন না করে বরং চোরাকারবারীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে। যে কারণে আজ সাধারণ যাত্রীরা ট্রেন ভ্রমণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কঠোর হলে চোরকারবারীদের তৎপরতা কমবে বলে তিনি জানান। বেনাপোল রেল ফাঁড়ির ইচার্জ এস আই নজরুল ইসলাম বলেন, রেল যাত্রীসেবা বাড়াতে ও চোরাচালানীদের প্রতিরোধ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়ে থাকে। মাইকিং করে চোরাচালানীদের পণ্য না ওঠানোর জন্য সতর্ক করে দেয়া হয়। মহিলাদের মালামাল আটক করলেও তারা হাত পা জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করে। বাধ্য হয়ে ছেড়ে দিতে হয়। রেলস্টেশনে নেশাখোর ও বহিরাগতদের রুখতে পরবর্তীতে আরো কঠিন পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে বলে তিনি জানান। বেনাপোল রেলস্টেশনের মাস্টার মোঃ সাইদুজ্জামান জানান, গত অর্থ বছরে স্টেশন থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা আয় হয়েছে। শুধু গত বছরে নয় প্রতি অর্থবছরে এ স্টেশন থেকে সরকার আয় করেছে কোটি টাকার উপরে। রেলস্টেশন উন্নয়নে কাজ চলমান। স্টেশনের সমস্যাগুলো কতৃর্পক্ষকে জানান হয়েছে বলে জানান তিনি।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়