নিজস্ব প্রতিবেদক
যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া ধোপাদী মোড় এলাকার বাসিন্দা আফরোজা বেগম (৪০) নামে এক নারী পুলিশের নির্যাতনে মারা গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের বিরুদ্ধে ইজিবাইক বিক্রির এক লাখ ৮০ হাজার টাকা লুট ও আর দুই লাখ টাকা ঘুষ দাবিরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। দাবিকৃত ঘুষের টাকা দিতে না পারায় ওই নারীকে ফ্যানে ঝুলিয়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যার অভিযোগ করেছেন মৃতের ছেলে মুন্না। মৃত আফরো নওয়াপাড়া গ্রামের জলিল মোল্লার স্ত্রী। আফরোজা বেগমের ভাই নুর ইসলাম হাওলাদার বলে, গতকাল রাতে আমার বোন বাড়ির পাশে পানি আনতে যান। এ সময় বাড়িতে পাঁচজন পুলিশ আসে। এর মধ্যে সিলন দারোগা বোনকে বলে কাছে যা আছে বের করে দিতে। সে তার কাছে কিছু নেই জানালে সিলন দারোগা একজন নারী পুলিশকে ফোন করে ডেকে আনেন। তিনি বোনের শরীর তল্লাশী করেও কিছু পাননি। এরপর সিলন দারোগা বোনকে চড় দিতে দিতে শোয়ায়ে ফেলেন।পরে নারী পুলিশের সহায়তায় ঘরে দরজা দিয়ে কী করেছে জানি না। তবে আমার সামনে বোনের চুল ফ্যানের সঙ্গে বেঁধে ঝুঁলিয়ে দিয়েছে। এদিকে, মুন্নার অভিযোগ স্থানীয় একটি মহলের ইন্ধনে পুলিশের এসআই শিলন ও শামছু শনিবার রাত ১২টার দিকে তাদের বাড়িতে যান। রাতে পুলিশ কোথা থেকে একটা লোক ধরে এনে ২৩ পিচ ইয়াবা দিয়ে বোনকে বলে, তুই দিয়েছিস। সেই সময় মায়ের কাছে টাকা দাবি করা হয় নইলে মাকে ২০০ পিস ইয়াবা দিয়ে চালান করে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। মাকে মারধরের পরে রাত দুইটা তিনটার দিকে পুলিশ তাকে অভয়নগর থানায় নিয়ে যায়। তারা নিজেদের কাছে থাকা ইয়াবা দিয়ে তার মাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। বাড়িতে ভাংচুর করে। ইজিবাইক বিক্রির টাকা লুট করে। আরও ঘুষ দাবি করে। দাবি পূরণ করতে না পারায় মাকে পৈশিচক নির্যাতনে মরতে হয়েছে। তিনি বলেন-রোববার (২ জুন) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মায়ের মৃত্যু হয়েছে। তবে পুলিশের দাবি তাকে ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়। পরে তিনি অসুস্থতাবোধ করলে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। সকালে ফের অসুস্থ হয়ে পড়লে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে বেলা ১১টার দিকে তার মৃত্যু হয়। মারপিটের অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের। তবে পুলিশের এই বক্তব্য নাকচ করে করে দিয়েছে মৃত আফরোজা বেগমের ছেলে মুন্না মোল্লা। তার অভিযোগে-রাত ১২টার পর পুলিশ তাদের বাড়িতে গিয়ে অশ্লীল গালিগলাজ শুরু করে। এক পর্যায়ে তারা মাকে আটক করে ইয়াবা পাওয়া গেছে বলে প্রচার দেয়। প্রায় ঘন্টাখানেক তাণ্ডব চালায়। আরও দুই লাখ টাকা দিলে মাকে ছেড়ে দেবে বলে পুলিশ জানায় কিন্তু এত টাকা ঘুষ দেয়ার সামর্থ ছিল না। যেকারণে রাত ১টার দিকে মাকে থানায় নিয়ে যায়। সকালে থানায় গিয়ে দেখতে পাই মা খুব অসুস্থ্য। পুলিশকে অনুরোধ করে তার মাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা কয়েকটি টেস্ট করাতে বললে পুলিশ সদস্যরা সেগুলো না করিয়ে ফের থানায় নেয়। আবারও অসুস্থ হয়ে পড়লে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মায়ের মৃত্যু হয়। যশোর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আব্দুস সামাদ জানান, ওই নারীকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছে। ময়নাতদন্ত ছাড়া তার মৃত্যুর কারণ বলা যাবে না। এদিকে হাসপাতালে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা এই বিষয়ে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে মোবাইল ফোনে অভয়নগর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম দাবি করেন, মাদকসহ আটক ওই নারী হৃদরোগে অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। এদিকে, অভয়নগর থানা পুলিশের দাবি- রাত দেড়টার দিকে তারা অভিযানে যান। তারা ৩০ পিস ইয়াবাসহ আফরোজা বেগমকে গ্রেফতার করে থানায় নেয়। ২ জুন সকাল ৮.২০ মিনিটের দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত চিকিৎসার জন্য অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে নেয়া হয়। সাময়িক চিকিৎসা শেষে তাকে থানায় আনা হয়। পৌনে ১০টার দিকে পূনরায় অসুস্থতা বোধ করলে আবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অভয়নগর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্যে যশোর সদর হাসপাতালে প্রেরণ করেন। যশোর হাসপাতালে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অভিযানে অংশ নেয়া পুলিশ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন এসআই সাইফুল ইসলাম, এএসআই (নিঃ) সিলন আলী, এএসআই (নিঃ) শামসুল হক ও মহিলা কং/১৭৮৬ রাবেয়া খানম।
৩০ পিচ ইয়াবাসহ মৃত মহিলা আসামির নামে অভয়নগর থানার মামলা করা হয়েছে। যার নম্বর ০৫, তারিখ-০২/০৬/২৪ খ্রিঃ, ধারা-২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইনের ৩৬(১) ১০(ক) রুজু করা হয়েছে। যশোরের সিনিয়র আইনজীবী জিএম মুছা এ প্রসঙ্গে বলেন-রাত ১২টার পর পুলিশ এভাবে অভিযান চালাতে পারে না। পুলিশ আইনে বাধা আছে। যদি রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কোনো আসামিকে গ্রেফতার করা জরুরী হয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রে আসামির প্রতিবেশি অন্তত ৩ জনকে ডাকতে হয়। তারা পুলিশের দেহ তল্লাসী করবে। তারপর পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারে। অন্যত্থায় ভোর ৫টা পর্যন্ত আভিযানিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের অপেক্ষা করার বিধান রয়েছে। তিনি আরও বলেন-মৃতের ছেলে মুন্নার অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পুলিশের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হতে পারে। সিনিয়র আইনজীবীর ভাষ্যমতে,পুলিশ শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছে। পুলিশের ভাষ্যমতে রাত দেড়টার দিকে অভিযান চালিয়ে ওই নারীকে গ্রেফতার হয়েছে। এত রাতে কোনো বাড়িতে অভিযান পরিচালনার এখতিয়ার পুলিশের নেই। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবার থানায় মামলা করতে পারেন। থানা মামলা নিতে অস্বীকার করলে আদালতে মামলা করার সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে মুঠোফোনে কল করা হলে অভয়নগর থানার ওসি এসএম আকিকুল ইসলাম বলেন. ওই নারীকে ইয়াবাসহ পুলিশ গ্রেফতার করে। সকালে তিনি অসুস্থ্যতাবোধ করলে নারী পুলিশ ও মৃতের ছেলেদের মাধ্যমে হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থা তার মৃত্যু হয়।

