সরকার পরিবর্তনের পর সারা দেশেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে দেখা যায়। জুলাই-আগস্টে দেশের অনেক থানায় আক্রমণ হয়। অনেক থানা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে পুলিশ। এ অবস্থায় দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা বর্তমান সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থিতিশীলতা বিনষ্টের মতো কর্মকাণ্ড ঘটেছে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগামী দুই মাসের জন্য রাজধানীসহ সারা দেশে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দিয়েছে সরকার।
সেনাবাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে ঢাকাসহ সারা দেশে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে গত ১৯ জুলাই দিবাগত রাতে সারা দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন ও কারফিউ জারি করেছিল তৎকালীন সরকার। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এখনো সারা দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে এই বাহিনী দায়িত্ব পালন করছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মানুষ যাতে নিরাপত্তাবোধ নিয়ে জনবান্ধব পরিবেশে চলাচল করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অতীতে এটিও লক্ষ করা গেছে যে সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে দল-মত-নির্বিশেষে দেশের জনগণ অধিক নিরাপত্তা, নিশ্চয়তা বোধ করেছে। গত মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে আরো বলা হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ১২(১) ধারা অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৬৪, ৬৫, ৮৩, ৮৪, ৯৫(২), ১০০, ১০৫, ১০৭, ১০৯, ১১০, ১২৬, ১২৭, ১২৮, ১৩০, ১৩৩ ও ১৪২ ধারা অনুযায়ী, সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা নির্ধারিত সময়ে তাঁদের বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। তবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে দায়িত্ব পালন করবেন। সেনা কর্মকর্তাদের বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার কারণে এখন থেকে সিআরপিসি অনুযায়ী তাঁরা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, সেনা কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়ার পর রাজধানীসহ সারা দেশে যৌথ বাহিনীর অভিযানের গতি বেড়েছে। যৌথ বাহিনীর অভিযানে বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনা থেকে গত সোমবার রাত পর্যন্ত লুট হওয়া ১৫৫টি অস্ত্র উদ্ধার এবং ৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জানা গেছে। রাজধানীজুড়ে ট্রাফিক পুলিশকেও অধিকতর সক্রিয় হতে দেখা গেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব গণমাধ্যমকে বলেছেন, মানুষ যাতে নিরাপদ বোধ করে এবং জনবান্ধব পরিবেশে চলাচল করতে পারে, সে জন্য সেনাবাহিনীকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা, যাঁদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা আছে, তাঁদের সঙ্গে এ ক্ষেত্রে কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি হবে না। কাজেই সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া নিয়ে ভুল বোঝার কোনো অবকাশ নেই। সাংবিধানিক নিয়মরীতি মেনেই বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা দেবে সেনাবাহিনী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, দেশের স্বার্থেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অতীতেও জাতীয় সংকটে বিভিন্ন সময়ে সেনাবাহিনীকে এই ক্ষমতা দেওয়ার নজির আছে। তবে সেনাবাহিনীকে বিচারিক এই ক্ষমতা বা ফৌজদারি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো সতর্কভাবে প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত, নিষ্ঠাবান ও দক্ষ একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে সবাইকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। সেনা কর্মকর্তারা বিচারিক ক্ষমতা পাওয়ায় দেশের মানুষ নিরাপদ বোধ করুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

