খুলনা প্রতিনিধি॥
ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যার প্রভাবে খুলনায় মৎস্য সম্পদে ক্ষতি হয়েছে ৯৪ কোটি ৬ লাখ টাকা। আক্রান্ত হয়েছে ২১ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমির ফসল। এছাড়া তীব্র জলাবদ্ধতায় খালের আশপাশে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। এখনও ডুবে রয়েছে নিম্নাঞ্চল। যা মৎস্য চাষী, কৃষক ও মানুষের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। গত সপ্তাহে ৩দিন খুলনায় ৩২৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এ তথ্য জানান খুলনা আবহাওয়া অধিদফতরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোঃ আমিরুল আজাদ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, খুলনা মেট্রোপলিটন থানাসহ ৯ উপজেলায় (পাইকগাছা, কয়রা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, ফুলতলা, দিঘলিয়া, রূপসা ও তেরখাদা) ৪২৭টি খাল রয়েছে। এর মধ্যে প্রবহমান রয়েছে ১৫৫টি। ভরাট ও সরু হয়ে ২৭২টি খালের নাব্য নেই। নাব্য হারানো খালের মধ্যে লবণচরায় ২টি, দৌলতপুর ২টি, রূপসায় ৩০টি, তেরখাদায় ৫টি, ফুলতলায় ৩৭টি, দিঘলিয়ায় ১৪টি, ডুমুরিয়ায় ৪৩টি, বটিয়াঘাটায় ৫৭টি, দাকোপে ৪০টি, কয়রায় ২৭টি ও পাইকগাছায় ১৫টি। এ ছাড়া ৪২৭টি খালের মধ্যে ৯ উপজেলায় ইজারা দেওয়া আছে ১১৬টি। যে গুলো নেট-পাটা ও বাঁধ দিয়ে খণ্ড খণ্ড করে মাছ চাষ করা হচ্ছে। এতে তিনদিনের ভারী বৃষ্টিতে খাল গুলোতে পানির অবাধপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। খালের আশপাশে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, ভারী বর্ষণ, বাতাস ও জলাবদ্ধতায় ফসলের ক্ষেত ডুবে ১৭ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমির রোপা আমন, ৩ হাজার ৯০ হেক্টর জমির সবজি, ১৬ হেক্টর জমির মরিচ, ৮৪ হেক্টর জমির পেঁপে, ২৫০ হেক্টর জমির শিম, ২০ হেক্টর জমির টমেটো, ২৩০ হেক্টর জমির তরমুজ, ২০ হেক্টর জমির পান ও ৫৫ হেক্টর জমির কলা আক্রান্ত হয়েছে। যা নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষক। কয়রার উপজেলার বাসিন্দা সৌরভ ও হাসমত জোয়াদ্দার বলেন, ভারী বর্ষণে রোপা আমনের বীজতলার চারা গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। এখন পাইকগাছার কপিলমুনি এলাকা থেকে ধানের চারা ক্রয় করে রোপন করতে হবে।
জেলা মৎস্য অফিসার জয়দেব পাল জানান, বর্ষার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় খুলনার ৪৩টি ইউনিয়নের ৩২০ হেক্টর আয়তনের ১ হাজার ১৯৫টি দিঘি ও পুকুর এবং ৫ হাজার ৭২৬ হেক্টর আয়তনের ৭ হাজার ৫১০টি মৎস্য ঘেরের ক্ষতি হয়েছে। এতে সাদা মাছের ক্ষতির পরিমাণ ৫ হাজার ৮১০ দশমিক ৩৪ মেট্রিক টন, যার আনুমানিক মূল্য ১৭ কোটি ১২ লাখ টাকা। চিংড়ি মাছের ক্ষতির পরিমাণ ৭ হাজার ৩২১ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন, যার আনুমানিক মূল্য ৫৮ কোটি ১৭ লাখ। সাদা মাছের পোনার ক্ষতির পরিমাণ ১৮৮ দশমিক ৫০ লাখ, যার আনুমানিক মূল্য ৫ কোটি ৫৯ দশমিক ৫০ লাখ টাকা। চিংড়ি মাছের পোনার ক্ষতির পরিমাণ ৫৩৫ লাখ, যার আনুমানিক মূল্য ৬ কোটি ২০ লাখ টাকা। এছাড়া অবকাঠামোয় ৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। যা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন চাষীরা। এছাড়া ভারী বৃষ্টিতে নগরীর রয়্যাল মোড়, সাতরাস্তা মোড়, টুটপাড়া, মুজগুন্নি, রায়েরমহলসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুপানি জমে। বাস্তুহারা কলোনিসহ শহরে নিমাঞ্চলে এখনো পানিতে ডুবে রয়েছে। এছাড়া গ্রামের নিম্নাঞ্চলের অনেক বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পানিতে নিমজ্জিত হয়। এখনও পানিবন্দি হয়ে আছে অনেক পরিবার। ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ মোক্তার হোসেনসহ বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গোনালী-বামুন্দিয়া, রংপুর, বিলপাটিয়া, শরাফপুর গ্রামে বাড়ি-ঘর, সড়ক, ফসলী জমি ও মৎস্য ঘের পানিতে ডুবে যায়। ভেসে গেছে সাদা মাছ ও গলদা-বাগদা চিংড়ি। কিছু কাঁচাঘরের দেওয়ার ধসে পড়েছে। অনেক পরিবার এখনও পানিবন্দি রয়েছেন। এ ব্যাপারে খুলনার নবাগত জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ইজারা বাতিল করে খাল ও জলাশয় গুলো মুক্ত রাখতে কমিটি গঠন করা হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসন কাজ শুরু করেছে।

