উৎপল মণ্ডল, শ্যমনগর
‘ছাওয়ালডা বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে এত টুকু জানতি চাই’, চারডে বছর হতি গেছে আজও কোন তার কোন সন্ধান পাচ্ছি নে’- কথাগুলো শেষ না হতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন কফিল উদ্দীন শেখ। স্বজনদের চেষ্টায় নিজেকে সামলে নিয়ে সত্তোরর্ধ্ব বয়সী এ বৃদ্ধ আরও বলেন, ‘গরু আনার কথা বলে তারা নে গেলো, সক্কলি ফিরে এলেও শুধু আপমার সন্তানডার হদিস নি, জঙ্গলে নে মেরে ফিলে এসে এখন আবার মামলা তুলতি হুমকি দেচ্ছে’।শ্যামনগর উপজেলার পশ্চিম কৈখালী গ্রামের মৃত কেয়ামউদ্দীন শেখের দাবি ছেলে রতন শেখকে স্থানীয় চোরাকারবারীরা বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। ভারত থেকে অবৈধভাবে গরু আনার কথা বলে বনের মধ্যে নিয়ে তাকে গুম করা হয়। সে ঘটনায় মামলায় দায়ের করেও আজ অবধি কোন কুল কিনারা করা যায়নি। বরং মামলা তুলে নিতে বার বার হুমকি দেয়ার পাশাপাশি উক্ত মামলার স্বাক্ষীদের নানাভাবে হয়রানী করছে আসামীরা। স্থানীয় সুত্রে জানা যায় দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় পশ্চিম কৈখালী মুলত চোরকারবারীদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত। সীমান্তবর্তী কালিন্দি নদীসহ পাশ্বস্থ সুন্দরবনকে ব্যবহার করে স্থানীয় চোরকারবারীরা মাদকদ্রব্য, অস্ত্র, গলদার রেণু, মূল্যবান ঔষধসহ গরু আনা নেয়ার কাজ করে। আর রতনের মত দিন এনে দিন খাওয়া মানুষদের তারা চোরচালানের পণ্য আনা নেয়ার কাজে শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করে। নিখোঁজ রতনের বোন রত্না বেগমসহ স্থানীয়রা জানায় সাহেবখালীর মামুন কয়াল ও রফিকুল কয়াল নেদা গত ২০২১ সালে ২০ জানুয়ারী রাত আটটার দিকে কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে রতনকে ডাকতে আসে। অসুস্থতার কথা জানালে আরও কয়েকজনকে সঙ্গে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়ে তারা অকেটা ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপুর্বক রতনকে নিয়ে যায়।
রতনের পিতা কফিল উদ্দীন জানায় গরু আনার কথা বলে রতনকে নিয়ে গেলেও দুই দিন পরে এসে তার ছেলেকে বাঘে খেয়েছে বলে প্রচার চালানো হয়। এসময় রতনের সাথে যাওয়া মুছাসহ অন্যরা অক্ষত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তাদেরকে টাকার বিনিময়ে বিষয়টি চেপে যাওয়ার প্রস্তাব দেয় চোরাচালানে জড়িতরা। একপর্যায়ে শ্যামনগর থানায় মামলা দায়েরে ব্যর্থ হয়ে আদালতের শরনাপন্ন হন নিখোঁজ রতনের পরিবার। কফিল উদ্দীন আরও জানান আদালতের নির্দেশে পরবর্তীতে শ্যামনগর থানা মামলা রেকর্ড করলেও একজন আসামীকে তারা স্পর্শ করেনি। বরং মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে তারা আসামীদের অব্যাহতি দিয়ে মামলায় চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। এঘটনায় তিনি আদালতে উপস্থিত হয়ে নারাজি দেয়ায় বিষয়টি তদন্তে এখন পিবিআইকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কফিল উদ্দীনের অভিযোগ আসামীরা এলাকায় ব্যাপক প্রভাবশালী। তাছাড়া স্থানীয় বিএনপির এক শীর্ষ নেতার ভাই বর্তমানে ঐ চোরাকারবারীদের সহায়তা করছে। এমতাবস্তায় নিজের একমাত্র ছেলের অপহরণ ও গুমের ঘটনার বিচার পাওয়া নিয়ে তিনি উদ্বীগ্ন। নিখোঁজ ছেলের তিন সন্তানের লালন পালন মরার উপর খড়ার ঘাঁ হয়ে দেখা দিয়েছে বলেও দাবি ঐ বৃদ্ধের। অভিযোগের বিষয়ে প্রধান অভিযুক্ত মামুন কয়াল জানান, রতনকে গরু নেয়ার জন্য পাঠানো হলে বনের মধ্যে সে বাঘের কবলে পড়ে নিহত হয়। পরবর্তীতে তার পরিবার টাকার প্রলোভনে পড়ে অপহরণের পর গুমের মামলা দিলেও পুলিশ তদন্তে কোন সত্যতা না পেয়ে ফাইনাল দিছে। পুনরায় নারাজি দেয়ায় বাদির সাথে সামান্য বাদানুবাদ হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই এর উপ-পরিদর্শক সঞ্জয় দত্ত বলেন মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্নের আশা করছি। শ্যামনগর থানার ওসি (তদন্ত) ফকির তাইজুর রহমান বলেন, স্বতন্ত্র একটি সংস্থা রতন শেখ নিখোঁজের বিষয়টি তদন্ত করায় পুলিশের কিছু করার নেই। তবে মামলার বাদি বা স্বাক্ষীদের কেউ কোন প্রকার হুমকি ধমকী ভয়ভীতি দেখালে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

