প্রতিবন্ধী লিয়ন দাসের স্বপ্ন আদর্শ শিক্ষক হওয়ার

আলমগীর হোসেন, পাটকেলঘাটা ॥
জন্ম থেকে শারিরীক প্রতিবন্ধী হলেও আদর্শ শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন লিয়ন কুমার দাস। আর দশটা ছেলেমেয়ের মতো তার জীবন ধারণ স্বাভাবিক না হলেও উচ্চ শিক্ষাই শিক্ষিত হওয়ার প্রবল ইচ্ছে শক্তি ধারণ করে লিয়ন। সমাজে পিছিয়ে পড়া প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের কর্মদক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কাজ করার ইচ্ছে তার। প্রতিবন্ধী কেউ যেনো সমাজ ও পরিবারের বোঝা না হয়ে উপার্জন সক্ষম মানুষ হতে পারে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে নিজেকে একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নের কথা এভাবে বর্ণনা করছিলেন এইচএসসি পড়ুয়া ছাত্র লিয়ন দাস। তিনি সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা থানার নগরঘাটা গ্রামের স্বপন কুমার দাস ও জ্যোৎস্না রাণী দাস দম্পতির বড় ছেলে।
লিয়ন দাস বলেন, ২০২৩ সালে আমি নগরঘাটা কবি নজরুল বিদ্যাপীঠ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় পাস করে বেগম খালেদা জিয়া কলেজে এইচএসসি মানবিক বিভাগে ভর্তি হয়েছি। অন্য শিক্ষার্থীদের মত আমি ডান হাতে লিখতে পারিনা। আমি বাম হাত দিয়ে লিখি। তবে সব সময় আমার হাত নড়াচড়া করে। স্বাভাবিক শক্তি পাইনা। এজন্য হাতের লেখা খারাপ হওয়ায় এসএসসিতে নাম্বারও কম পেয়েছি। কথা বলতে আমি কিছুটা জড়তা উপলব্ধি করি। গুছিয়ে বলার চেষ্টা করলেও মানুষের বুঝতে কিছুটা অসুবিধা হয়। তিনি আরো বলেন, সরকারিভাবে প্রতিবন্ধি ভাতার যে অর্থ পাই সেটা আমার পড়াশোনার জন্য যথেষ্ট নয়। আমি কখনো বসে থাকি না। লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিওর প্রকল্পের কাজ করি। বাবা যে ইনকাম করে তাতে আমাদের সংসার ঠিকমতো চালাতে পারে না। ৩ শতক জমির উপর আমাদের ভিটে বাড়ি। এছাড়া কোনো কৃষি জমি নেই। অভাবের কারণে পরিবার থেকে আমার ঠিকমতো চিকিৎসা সেবা দিতে পারিনি। বর্তমানে কোনো ওষুধ আমি খাইনা। তার মা জ্যোৎস্না রাণী দাস বলেন, ২০০৬ সালে লিয়ন শারিরীক প্রতিবন্ধী হয়েই জন্ম নিয়েছে। শিশু বয়সে সেটা আমরা কেউ বুঝতে পারিনি। সে আমার প্রথম ছেলে সন্তান হওয়ায় সবাই খুবই খুশি হয়েছিল। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে বুঝতে পারি লিয়ন আর দশটা ছেলের মতো স্বাভাবিক নয়। তার কথাবার্তা চালচলনে অনেক অসংগতি দেখা যায়। স্থানীয় বিনেরপোতা বিদেশি সংস্থা ঋশিল্পিতে কিছুদিন ডাক্তার দেখাই কিন্তু আশানুরূপ কোনো পরিবর্তন না হওয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে আর অহেতুক চেষ্টা তদবির না করতে চাপ প্রয়োগ করে। আমার স্বামী একজন ভ্যান চালক। অভাবের সংসারে ৩ ছেলেকে নিয়ে কোন রকমে দিন পার করছি। লিয়নের প্রবল ইচ্ছা থাকায় তাকে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ছেলের ইচ্ছা পূরণের চেষ্টা অব্যাহত রাখায় আশপাশের অনেক মানুষ কটু কথা বলে। এমন ছেলের ভবিষ্যৎ কি? এত লেখাপড়া করিয়ে কি হবে? আরো কত রকম কথা। সেসব কথায় কর্নপাত না করে স্বামী স্ত্রী দুজনই চেষ্টা করে যাচ্ছি ছেলের স্বপ্ন শিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলার। বাকিটা ইশ্বরের ইচ্ছা। পাশাপাশি ছেলের পড়াশোনার খরচ চালাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। এ বিষয়ে নগরঘাটা কবি নজরুল বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক সাইদুল আলম বাবলু বলেন, লিয়ন দাস আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন খুবই ভাল মেধাবী ছাত্র। আমরা শিক্ষকরা তাকে খুবই স্নেহ করি। সেও আমাদের যথেষ্ঠ সম্মান করে। তার অদম্য ইচ্ছাকে আমরা সম্মান জানাই। তার ইচ্ছে অনুযায়ী সে যেন সুশিক্ষাই শিক্ষিত হয়ে একজন আদর্শ্য শিক্ষক হতে পারে সেই দোয়া করি। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মনোজ কান্তি বলেন, আমি তালায় সদ্য যোগদান করেছি। বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে পরে জানাতে পারব। তবে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ভাতা সহ বিশেষ ব্যবস্থার উপর নজর দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মোঃ রাসেল জানান, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও সার্বিক কল্যানের লক্ষ্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এজন্য লিয়ন কুমার দাস কে প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়া হচ্ছে। তার উচ্চ শিক্ষার জন্য যদি পারিবারিক ভাবে আমার কাছে সহযোগিতা চায় তবে আমি জেলা প্রশাসক কে জানিয়ে এলআর ফান্ড (স্থানীয় ভাবে সংগৃহীত তহবিল) থেকে আর্থিক সহযোগীতা করতে পারব। এছাড়া তার উচ্চ শিক্ষার প্রতি যে তীব্র আকাঙ্খা তাকে আমি সন্মান জানাই।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়