প্রতিদিনের ডেস্ক
ঘুষ প্রদানের অভিযোগে ভারতের আদানি গ্রুপের কর্ণধার গৌতম আদানি ও তার সহযোগীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত। আদালতের অভিযোগে বলা হয়েছে, সৌর বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি লোভনীয় কাজ পেতে ভারতীয় কর্মকর্তাদের ঘুষ প্রদান করেছেন গৌতম আদানি। এ কারণে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর ড. ইজাজ হোসেন বলেছেন, গৌতম আদানির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও গ্রেফতারি পরোয়ানার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হবে। তিনি জানিয়েছেন, আদানির সঙ্গে থাকা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চুক্তি তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছে ঢাকার একটি আদালত। ঠিক এর পরের দিনই গৌতম আদানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে জারি হয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা। তিনি বলেন, “আদানি ও শেখ হাসিনা সরকারের মধ্যে হওয়া জ্বালানি চু্ক্তি প্রথম থেকেই বিতর্কিত ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর ভারতের ধনকুবের গৌতম আদানির জন্য আরও দুঃসংবাদ এসেছে; কেনিয়ার সঙ্গে চুক্তি বাতিল ও শেয়ারবাজারে ধসের মুখে পড়েছে তার কোম্পানি। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে ঘুষ ও প্রতারণার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি পর কেনিয়া সরকার আদানি শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে ২৫০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি একটি চুক্তি বাতিলের ঘোষণা কেনিয়া সরকার। রয়টার্সের কয়েকটি প্রতিবেদেন এসব তথ্য জানিয়ে আরও বলা হয়েছে, অর্থায়ন নিয়েও সমস্যার মুখে পড়েছে আদানি গ্রুপ। নতুন ঋণ না দেওয়ার বিষয়ে ভাবছে ব্যাংকগুলো। দুঃসংবাদের মধ্যে আরও রয়েছে, আদানি গ্রুপের জারি করা সব বন্ড শুক্রবার দ্বিতীয় দিনের জন্যও নিম্নমুখী রয়েছে; অবশ্য বৃহস্পতিবার ধসের পর কিছু শেয়ার স্থিতিশীল হয়েছিল। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী আদানি শিল্প গোষ্ঠীর চেয়ারপারসন গৌতম আদানি। গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের কৌঁসুলিরা আদানি ও তার কয়েকজন সহযোগীকে অভিযুক্ত করার পর আদালত তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। রয়টার্স লিখেছে, আদানির সঙ্গে তার ভাতিজা সাগর আদানির বিরুদ্ধেও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের আদালত। এনডিটিভি বলছে, আদানি গোষ্ঠী এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌঁসুলিদের অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে অভিহিত করেছে। পাশাপাশি তারা ‘সম্ভাব্য সব আইনি ব্যবস্থা’ অবলম্বন করার ঘোষণা দিয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর ড. ইজাজ হোসেন বলেছেন, হাসিনার আমলে হওয়া অন্য চুক্তির মতো এটিও কোনো টেন্ডার ছাড়া হয়। তা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার আদানির প্রতি ইতিবাচক পদক্ষেপ ও আলোচনা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু আদানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযোগের পর, আলোচনার জায়গা খুব সম্ভবত কমে যাবে। ফলে বিদ্যুতের দাম পুননির্ধারণে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তীব্র চাপে পড়বে আদানি গ্রুপ।’ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করেছিল দ্য হিন্দু। কিন্তু তারা কোনো মন্তব্য করেনি। তবে দেশটির কর্মকর্তারা বলেছেন, জি২জি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে এখনো বিদ্যুৎ সরবরাহ করছেন তারা। কিন্তু আদানির মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি নিয়ে তারা প্রয়োজন না হলে হস্তক্ষেপ করবেন না। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে আদানি পাওয়ার ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা থেকে বাংলাদেশে প্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করে। এই কেন্দ্রটি বানানো হয়েছে শুধুমাত্র বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর জন্য। বুয়েটের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. ইজাজ বলেছেন, আদানি বাংলাদেশকে চুক্তির প্রস্তাবে জানায় তারা অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা এনে সেগুলো দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে বাংলাদেশে পাঠাবে। যেহেতু বাংলাদেশে গভীর সমুদ্র বন্দর নেই তাই বিষয়টির যৌক্তিকতা ছিল। তবে সমালোচকরা পরবর্তীতে বলতে শুরু করেন, আদানি তো ভারতের সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি পেয়েছে। কিন্তু এই ভর্তুকি তো বাংলাদেশের সঙ্গে তারা ভাগাভাগি করেনি। বিদ্যুতের যে দাম আদানি নির্ধারণ করেছে সেটি নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল। এমনকি শেখ হাসিনা সরকারের সময়ও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে হাসিনার ভালো সম্পর্ক থাকায় আদানির পক্ষে যায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড আদানির কাছে বিদ্যুতের দাম পুনর্মূল্যায়ন করার জন্য একটি চিঠি দেয়। ওই সময় আদানি জানায় তারা প্রতি মেট্রিক টন কয়লা ৪০০ ডলারে কিনছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড জানায়, তারা অন্যান্য কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে একই পণ্যের জন্য ২৫০ ডলারের কম দিচ্ছে। এদিকে আদালত যেহেতু আদানির সঙ্গে চুক্তি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। এতে করে বাংলাদেশ এখন পুরো চুক্তিটি পর্যালোচনা করতে পারবে।
আদানির সঙ্গে কেনিয়ার চুক্তি বাতিল : বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে ভাষণ দেওয়ার সময় কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো আদানি গ্রুপের সঙ্গে দুটি চুক্তি বাতিল করার ঘোষণা দেন। রয়টার্স লিখেছে, দুটির মধ্যে একটি চুক্তির অর্থমূল্য প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার। এই চুক্তি অনুযায়ী, কেনিয়ার জোমো কেনিয়াত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দ্বিতীয় রানওয়ে করার কথা ছিল আদানির। সেই সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি লিজের আওতায় বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনাল উন্নত করার কথা ছিল। পার্লামেন্টে রুটোর ঘোষণা অনুযায়ী, আদানির সঙ্গে আরেকটি ৩০ বছর মেয়াদি ৭৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের সরকারি-বেসরকারি খাতের অংশীদারত্ব (পিপিপি) চুক্তি বাতিল করেছে কেনিয়া। আদানি গোষ্ঠীর একটি কোম্পানি গত মাসেই কেনিয়ার জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের জন্য ৭৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের চুক্তিটি করেছিলেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, আদানির সঙ্গে চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পার্লামেন্টে করতালির ঝড় ওঠে এবং তাদের উচ্ছ্বাস করতে দেখা যায়। কেনিয়ার সঙ্গে চুক্তি বাতিলের পর সেটি নিয়ে আদানি গ্রুপের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে তাদের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে খুশি ছিলেন না দেশটির মানুষ। এ নিয়ে অনেক সমালোচনা-বিতর্ক ছিল কেনিয়ায়।
সূত্র: দ্য হিন্দু

