সুন্দর সাহা
অবশেষে বেনাপোল স্থলবন্দরে মিথ্যা ঘোষণায় ভারত থেকে আমদানি করা প্রায় ৩ হাজার ৬৭৫ কেজি ভায়াগ্রার একটি বিশাল চালান জব্দ করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এই বিপুল পরিমাণ ভায়াগ্রা বন্দর থেকে অবৈধভাবে পাচার হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কয়েক গুণ জোরদার করা হয়েছে। আমদানিকৃত পণ্য ঘোষনা দিয়েছে ‘কোয়ার্টাজ পাউডার’ যার বিল অব এন্ট্রি নং ১৯০৪২ তারিখ ১৫/০৩/২০২৬। ৪৬৯ প্যাকেজের পণ্য চালানটি ৩২ নং ক্যামিকেল সেডে রয়েছে বলে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ জানান। মিথ্যা ঘোষনা দেওয়া ওই সব প্যাকেজে রয়েছে অনুমতি ছাড়াই ভায়াগ্রা বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল, ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক যৌন উত্তেজক ওষুধ তৈরীতে ও ব্যবহার করা হয় এক ধরনের এনার্জি ড্রিংক তৈরীতে ভায়াগ্রার কাঁচামাল মেশানো হয়। এধরনের এনার্জি ড্রিংক সেবনে সেবনকারীরা আসক্ত হয়ে পড়ে। বেনাপোল স্থল বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্রে ভায়াগ্রা ও ওষুধের অবৈধ চালান ধরা পড়ার পরও সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও সিএন্ডএফ-এর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া নিশ্চিতভাবেই উদ্বেগের বিষয়। এটি শুধু আইনি শিথিলতা নয়, বরং বন্দরের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও বৈধ বাণিজ্যের জন্য একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করে। পণ্য আমদানির পর পেরিয়ে গেছে চার মাস। কিন্তু অদৃশ্য কারণে বেনাপোল কাস্টমস কতৃপক্ষ এখনও কোন ফৌজদারী মামলা করেনি।
এদিকে নিয়ম অনুযায়ী ৩০ দিন এর মধ্যে এসব পণ্য আমদানিকারক গ্রহন না করলে নিলামে উঠার কথা থাকলেও অদৃশ্য কারণে প্রায় চার মাসেও নিলামেও উঠেনি। আর এসব চালান আমদানির সাথে কাস্টমস ও বন্দরের অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজস থাকার অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতির ফলে যেসব নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যখন আমদানিকারক বা সিএন্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা (যেমন লাইসেন্স বাতিল বা ফৌজদারি মামলা) নেওয়া না হয়, তখন অপরাধীদের মধ্যে এক ধরনের দায়মুক্তির মানসিকতা তৈরি হয়। এতে বৈধ পণ্যের আড়ালে নিষিদ্ধ বা শুল্কফাঁকি দেওয়া পণ্য আনার প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। বেনাপোল স্থল বন্দর দিয়ে মিথ্যা ঘোষাণা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভায়াগ্রা ও বিভিন্ন ধরনের ওষুধ আমদানি করেছে। আরাফাত এন্টারপ্রাইজ নামে ঢাকার একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান শিল্প কলকারখানার কাঁচামাল ঘোষনা দিয়ে ভায়াগ্রাসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ আমদানি করেছে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান যে সব পণ্য মিথ্যা ঘোষনা দিয়ে আমদানি করেছে তাকে বাধ্যতামুলক ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এর অনুমতি থাকতে হবে। কোন প্রকার অনুমতি না নিয়েই বেনাপোল কাস্টমস হাউস দিয়ে সিরামিক গ্লেজসহ গ্লাস উৎপাদনের কাঁচামাল ‘কোয়ার্টজ পাউডার’-এর পরিবর্তে ওমেপ্রাজল, সালফোনোমাইড/সালফো এন্টিবায়োটিক, ইটোরিক্সওক্সিব, হাউড্রোকুইনাইন, মোন্টেলুকাস্ট সোপিডয়াম, রিবোফাবিন সোডিয়াম ফসপেট জাতীয় ওষুধ তৈরির কাচাঁমাল আমদানি করে।
আমাদানিকারক আরাফাত এন্টারপ্রাইজের নিয়োগকৃত সিএন্ডএফ এজেন্ট হায়াদার এন্ড সন্স। অভিযোগ রয়েছে এই লাইসেন্সটি ভাড়ায় খাটে। এর আগেও জয়েন্ট কমিমনার জেসি)-র ফেসবুক ফ্রেণ্ড আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া ভাজাওয়ালার পুত্র আজিম-সামাদের অবৈধ পণ্য চালান ছাড় করাতে গিয়ে সাসপেণ্ড হয়েছে। এবার আমদানিারক আরাফাত এন্টারপ্রাইজের মালিক নিজেই লাইসেন্সটি ভাড়া নিয়ে নিজেরাই পণ্য খালাশের চেষ্টা করে। কিন্তু আরাফাত এন্টারপ্রাইজের শেষ রক্ষা হয়নি। পণ্য বেনাপোল কাস্টমস ও গোয়েন্দা সংস্থার কাছে ধরা পড়ার পর পরই গা ঢাকা দিয়েছে আমদানিকারক আরাফাত এন্টারপ্রাইজ ও কথিত সিএন্ডএফ কর্তৃপক্ষ। এর আগেও বেনাপোল কাস্টমস কয়েকদফা একাধিক ভায়াগ্রার চালান আটক করেছে। কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ মার্চ ‘আরাফাত এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘কোয়ার্টজ পাউডার’ ঘোষণা দিয়ে ভারত থেকে ১৬ টন পণ্য আমদানি করে। চালানটি খালাসের দায়িত্বে ছিল ‘হায়দার অ্যান্ড সন্স’ নামের একটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। সন্দেহ হওয়ায় কাস্টমস কর্মকর্তারা ল্যাব পরীক্ষায় চালানটিতে ১৩ ধরনের রাসায়নিকের উপস্থিতি পান, যার মধ্যে ৩ হাজার ৬৭৫ কেজিই ছিল ভায়াগ্রা। বর্তমানে জব্দকৃত এই চালানটি বন্দরের ৩২ নম্বর শেডে রাখা হয়েছে। এছাড়া ২০১৯ সালের মে মাসে ‘বায়েজিদ এন্টারপ্রাইজ’-এর মাধ্যমে ‘সোডিয়াম গ্লাইকোলেট’ ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা আরও ২,৭০০ কেজি ভায়াগ্রার একটি চালান বন্দরের ৩৪ নম্বর শেডে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে। সম্প্রতি বন্দর থেকে ৬ কোটি টাকার পণ্য পাচারের অভিযোগে ৫৭ জনের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনায় বন্দরের নিরাপত্তা ও অসাধু সিন্ডিকেটের যোগসাজশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর মধ্যেই গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, মিথ্যা ঘোষণায় আসা ভায়াগ্রার এই চালানটিও বন্দর থেকে অবৈধভাবে সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে গত ১ জুলাই বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার অতুল গোস্বামী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। কাস্টমসের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামিম হোসেন জানিয়েছেন, ৩২ ও ৩৪ নম্বর শেডসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ২৪ ঘণ্টার বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমানে আনসার সদস্য, বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থা ‘আল-আরাফা’ এবং বন্দরের নিজস্ব গোয়েন্দা সদস্যরা সার্বক্ষণিক নজরদারি করছেন। বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, “এ ধরনের ক্ষতিকারক মাদকদ্রব্য দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে তরুণ সমাজ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই চক্রের সাথে জড়িতদের শুধু শাস্তি নয়, সহযোগীদেরও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।” স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, গুটিকয়েক অসাধু ব্যবসায়ীর অপকর্মের কারণে সাধারণ ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন, যা বন্দরের স্বাভাবিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অত্যাধুনিক স্ক্যানিং মেশিন থাকা সত্ত্বেও বারবার এমন নিষিদ্ধ পণ্য প্রবেশের ঘটনায় বন্দরের নজরদারি ব্যবস্থা ও স্বচ্ছতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনার ঝড় উঠেছে। জানা গেছে, এর আগে এক চালানেই ছয় হাজার কেজি সিলডেনাফিল সাইট্রেট (যৌন উত্তেজক ওষুধ ভায়াগ্রার কাঁচামাল) ধরা পড়েছিল বেনাপোল স্থলবন্দরে। এরপরও বিভিন্ন সময়ে ভায়াগ্রার কাঁচামাল দেশে ঢুকেছে। এটি ঢুকছে মূলত সোডিয়াম স্টার্চ গ্লাইকোলেট নামে। সিলডেনাফিল সাইট্রেট, যা মূলত ওষুধ উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানে কিছু বিশেষ ওষুধের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইদানীং কিছু কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কোমল পানীয় উৎপাদনে এ উপাদান ব্যবহার করছে বলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে অভিযোগ জমা পড়েছে। বর্তমান ওষুধ ও কসমেটিক আইন অনুযায়ী, কোনো ধরনের ওষুধ আমদানি করতে হলে আমদানির আগে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নিতে হবে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আরাফাত এন্টারপ্রাইজ কোনো ধরনের অনুমতি নেয়নি বলেও নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। বেনাপোল কাস্টম হাউসের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিভিন্ন সময়ে এ বন্দর দিয়ে ভায়াগ্রার চালান এসেছে। এ কারণে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এ সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে অন্যান্য সময় মোটর পার্টসসহ বিভিন্ন কিছুর আড়ালে আনার চেষ্টা করলেও এবারের চিত্র ভিন্ন। শিল্পের কাঁচামাল ঘোষণার আড়ালে খালাসের চেষ্টা করেছিল বলেও জানান কর্মকর্তারা। এ ছাড়া মিথ্যা ঘোষণায় আনা এ পণ্য ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক যৌন উত্তেজক ওষুধ তৈরিতেও ব্যবহার করা হয় বলে জানা গেছে। এক ধরনের এনার্জি ড্রিংক তৈরিতে ভায়াগ্রার এ কাঁচামাল মেশানো হয়। এ ধরনের এনার্জি ড্রিংক সেবনকারী কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীরা আসক্ত হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, কারও হার্টে বা ব্রেনে সামান্যতম সমস্যা থাকলে, ভায়াগ্রা সেবনে তার মৃত্যু অবধারিত। তাই নির্ধারিত (চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ) চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এবং শারীরিক পরীা-নিরীা করে তবেই ভায়াগ্রা সেবন করতে হবে। বাইপাস সার্জারি, ব্লাডপ্রেশার ও ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীরা ভায়াগ্রা সেবন করতে পারবেন না। ভায়াগ্রা কেউ বেশিদিন সেবন করলে আসক্ত হয়ে যায়। আর এটা ছাড়তে পারে না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ভায়াগ্রা সেবন স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি বলেও জানিয়েছেন তারা।
