চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের ছয় বছর

২০১০ সালের ৩ জুন রাজধানীর নিমতলীতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডেরই পুনরাবৃত্তি যেন ঘটেছিল পুরান ঢাকার বনেদি এলাকা চকবাজারে। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশন থেকে ছড়িয়ে পড়া আগুনে ৭১ জন পুড়ে মারা যায়। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট ১৪ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি ‘অবহেলার কারণে সৃষ্ট অগ্নিসংযোগের ফলে মৃত্যু ঘটাসহ ক্ষতিসাধনের’ অভিযোগে একজন স্থানীয় বাসিন্দা চকবাজার মডেল থানায় মামলা করেন। মামলায় ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিকের দুই ছেলেসহ অজ্ঞাতপরিচয় ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, আসামিরা তাঁদের চারতলা বাড়ির বিভিন্ন ফ্লোর দাহ্য পদার্থের গুদাম হিসেবে ভাড়া দেন। দাহ্য পদার্থের কারণে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা চকবাজার থানার ওসি তদন্ত করে ২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। মামলাটি বিচারের জন্য ওই বছরের ২৮ মার্চ ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। একই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি হয়। ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি আদালত আসামিদের অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে দেন। একই সঙ্গে আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন। আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হলেও এ পর্যন্ত ১৬৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র চারজনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। এতে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। ছয় বছরেও ন্যায়বিচার না পাওয়ায় ভুক্তভোগীদের ধারণা, ভবন ও গুদামের মালিককে বাঁচাতে ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ। রাজধানী ঢাকায় শুধু নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে গত কয়েক বছরে এমন অনেক অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। সবখানেই যেন সামান্য স্বার্থের কাছে পরাজিত হয়েছে মানুষের জীবন। ‘জীবনের চেয়ে বাণিজ্য বড়’এটিই যেন বারবার প্রমাণিত হয়েছে সব ক্ষেত্রে। ২০১০ সালের ৩ জুন এই পুরান ঢাকারই নিমতলী এলাকায় রাসায়নিকের গুদামে আগুন লাগার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিল ১২৪ জন। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগেনি সেদিন। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনা থেকে যথেষ্ট শিক্ষা নেওয়ার ছিল। চুড়িহাট্টায় যে ভবনটি থেকে আগুনের সূত্রপাত, তারও নিচতলায় রাসায়নিক দ্রব্যের কারখানা ছিল। দোতলায় ছিল নানা দাহ্য পদার্থের গুদাম। সরু গলির মধ্যে ছিল রেস্তোরাঁ, যেখানে ব্যবহৃত হতো গ্যাস সিলিন্ডার। এ ছাড়া ছিল সরবরাহের অপেক্ষায় থাকা গ্যাস সিলিন্ডার ভর্তি পিকআপ। দাহ্য পদার্থ থাকা রাসায়নিকের কারখানা ও গুদাম থেকে আগুন ছড়িয়েছে সর্বত্র। পথচারীরাও রেহাই পায়নি আগুন থেকে। এর পরও কি আমরা সচেতন হয়েছি? ঘনবসতিপূর্ণ ঘিঞ্জি এলাকায় রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা যে কত বিপজ্জনক, তা প্রমাণিত হয়েছিল ২০১০ সালের ৩ জুন সন্ধ্যায়। সেই দুর্ঘটনার পর তালিকা করে ৮০০ রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা পুরান ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি, যার অনিবার্য ফল ছিল চুড়িহাট্টা। সেই চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের ছয় বছর পর এসে ন্যায়বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা করছে ভুক্তভোগীদের পরিবার। আমরা আশা করব, দ্রুত এই ঘটনার বিচার সম্পন্ন হবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়