করের বোঝা, বিনিয়োগে শঙ্কা

একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং জনমুখী বাজেটই পারে দেশের অর্থনীতিকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে। সম্প্রতি ঘোষিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘিরে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সরকারের উপদেষ্টামহল একে জনবান্ধব ও ব্যবসাবান্ধব বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) মতো সংগঠনগুলো তীব্র সমালোচনা করে এর নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেছে। তাদের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনীতির প্রধান সংকটগুলো আমলে নেওয়া হয়নি। একইভাবে আমলে নেওয়া হয়নি সাধারণ মানুষের সংকট কিংবা ব্যবসায়ীমহলের সংকট। বড় শিল্পের কাঁচামালের ওপর ভ্যাট বাড়িয়ে দেওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ফলে বাড়বে পণ্যের দাম আর সেই বোঝা বইতে হবে সাধারণ মানুষকে। নির্মাণ সামগ্রীর ভ্যাট বাড়ায় আবাসন ও নির্মাণ শিল্পে খরচ বেড়ে যাবে। এসব কারণে দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাজেটকে ‘সীমিত সম্পদ ও অনেক চাহিদার মধ্যে’ আনা হয়েছে বলে দাবি করেছেন। তবে সিপিডি বলছে, চলমান অর্থনৈতিক সংকটকে আমলেই নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে করকাঠামো নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা গেছে। বার্ষিক ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের মানুষকে ১২.৫ শতাংশ, ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ১৬.৭ শতাংশ, কিন্তু ৩০ লাখ টাকার বেশি আয়কারীদের মাত্র ৭.৬ শতাংশ কর দিতে হবে। এই বৈষম্যমূলক করবিন্যাস নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। সিপিডি একে ‘বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের’ অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেছে। অন্যদিকে বিজিএমইএ ও বিসিআই নতুন বিনিয়োগের পথ রুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
শিল্পে কর অব্যাহতি সুবিধা কমানো এবং কাঁচামালের ওপর ভ্যাট বাড়ানোর প্রস্তাব উৎপাদন খরচ বাড়াবে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দিতে পারে। বিসিআই সভাপতি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে চললে শিল্প ক্ষতির মুখে পড়বে।’ রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রণোদনা কমানোর ইঙ্গিতও রপ্তানি সক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি করছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান ঘোষিত বাজেট নিয়ে বলেছেন, ‘বাজেটে সমস্যাগুলোর স্বীকৃতি থাকলেও কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো রয়ে গেছে। রাজস্ব সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা, ব্যয়ের অদক্ষতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা—এসব পুরনো সমস্যার বিরুদ্ধে এবারও কোনো দৃশ্যমান সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’ আমরা মনে করি, প্রস্তাবিত বাজেটে বৈষম্য দূরীকরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে, তা অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। জনগণের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে, বরং করের আওতা বৃদ্ধি এবং অপচয় রোধের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া উচিত ছিল। পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়