জন-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হোক

প্রতিদিনের ডেস্ক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার সংকটের মুহূর্তে জনগণ আন্দোলনের মাধ্যমে পথ খুঁজে নিয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান সেই ধারাবাহিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানও একই ধারার একটি পরিণতি, যেখানে জনগণের অভিপ্রায় হিসেবে রাষ্ট্র বিনির্মাণের অনিবার্য দাবি সামনে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর খসড়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
আমরা মনে করি, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়, বরং এটি দেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণের একটি ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা। কালের কণ্ঠের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সনদটির খসড়ায় ৮৪টি ঐকমত্যভিত্তিক প্রস্তাব ও আট দফা অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধার ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে এই সনদই হবে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মূল দলিল। সংবিধান সংশোধন, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন—সব ক্ষেত্রেই প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনের প্রাথমিক রূপরেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের মর্যাদা প্রদান, বিচার নিশ্চিতকরণ এবং অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাবগুলো জাতীয় প্রত্যাশাকে প্রতিফলিত করেছে।
সনদের খসড়ায় বলা হয়েছে, এই সনদ নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকবে না। সনদসংক্রান্ত যেকোনো প্রশ্নের মীমাংসার দায়িত্ব থাকবে কেবল সুপ্রিম কোর্টের। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর যেভাবে আন্দোলন, সরকার গঠনসহ সার্বিক বিষয়ে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল, একইভাবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান বৈধতা পাবে।আর নির্বাচনের আগেই সনদের বাস্তবায়ন কাজ শুরু হবে।
সনদের চূড়ান্ত খসড়াকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ভাগে জুলাই সনদের পটভূমি, সংস্কার কমিশন গঠন এবং কমিশনের কার্যক্রমের বর্ণনা আছে। দ্বিতীয় ভাগে ঐকমত্য হওয়া বিষয়গুলো আছে। সর্বশেষ ভাগে রয়েছে সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা, যেখানে আটটি ধারায় অঙ্গীকারগুলো উল্লেখ করা হয়েছে।জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, প্রত্যাশিত জুলাই সনদের খসড়া এরই মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে। এই সনদের আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত ও বাস্তবায়নের পদ্ধতি কী হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আরেক দফা বৈঠক করা হবে। রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমে শিগগিরই জুলাই সনদ চূড়ান্ত করা হবে বলে আশা করেন তিনি।
জুলাই সনদের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। এটি কেবল একটি দলিল নয়, বরং রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের সম্ভাব্য ভিত্তি হবে এটি। সনদকে কার্যকর করতে হলে এর বৈধতা ও সর্বজনগ্রাহ্যতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এ জন্য প্রয়োজন আরো খোলামেলা সংলাপ, রাজনৈতিক দলগুলোর পূর্ণ অংশগ্রহণ এবং নাগরিক সমাজের মতামত অন্তর্ভুক্ত করা।
সর্বোপরি বলা যায়, জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ জনগণের রক্ত ও ত্যাগের প্রতীক হয়ে উঠবে—এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা। আমরা চাই, এটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সব দল ও গোষ্ঠীর ঐকমত্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা হোক এবং রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির সার্বিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুক।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়