গুম কেবল রাজনৈতিক নিপীড়নের একটি অস্ত্র নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সনদেও গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। গতকাল আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে একটি নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশে গুমের ঘটনায় বিচারহীনতার এক গভীর কুসংস্কৃতি গেড়ে বসেছে।এই সংস্কৃতি কেবল ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে নয়, গোটা সমাজব্যবস্থাকেই কলুষিত করছে।
গুমের কারণে বহু পরিবার চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। ছয় বছর ধরে নিখোঁজ স্বামীর শোকে কাতর নাসিমা আক্তারের মতো অসংখ্য পরিবারের আহাজারি প্রমাণ করে, গুম শুধু একটি রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি একটি মানবিক সংকট। তাদের প্রশ্ন, ‘আমি সধবা, নাকি বিধবা?’ প্রশ্নটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রতি এক তীব্র চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের শোক, অনিশ্চয়তা এবং মানসিক যন্ত্রণা সভ্য সমাজের জন্য একটি কলঙ্কস্বরূপ।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গুমের শিকার ব্যক্তিদের অনেকে গোপন বন্দিশালায় আটক ছিলেন বা আছেন। কেউ কেউ আবার ভারতীয় সীমান্ত পার হয়ে আটক হয়েছেন বলে সাম্প্রতিক তদন্তে উঠে এসেছে। গুম কমিশনের তথ্য বলছে, গুমের অভিযোগ যাচাইয়ে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতা স্পষ্ট হয়েছে।পাশাপাশি দেশের নদীগুলো গুমের শিকার ব্যক্তিদের মরদেহ ফেলার স্থান বা ‘ডাম্পিং স্টেশনে’ পরিণত হয়েছে। গত বছরের তুলনায় চলতি বছর নদীতে লাশ উদ্ধারের সংখ্যা অনেক বেড়েছে, যা এই অপরাধের মাত্রা ও ভয়াবহতাকেই তুলে ধরে।
গুম কমিশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২২০টিরও বেশি গুমের সত্যতা মিলেছে। এসব ঘটনার তদন্ত এবং ন্যায়বিচার প্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রতা ও বাধাবিপত্তি মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। জাতিসংঘের গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রতিবেদনও এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির ওপর আলোকপাত করেছে।তাদের সুপারিশে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা, গোপন বন্দিশালা বন্ধ করা এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, গুম একটি বৈশ্বিক সমস্যা হলেও স্বৈরশাসন ও রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ দেশে এটি ভয়াবহ রূপ নেয়। বাংলাদেশে গত দেড় দশকে শত শত মানুষকে গুম করা হয়েছে, কিন্তু একটি ঘটনারও ন্যায়বিচার হয়নি। তবে আশার কথা, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ‘গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়া অনুমোদন করেছে। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে কেবল আইনের খসড়া নয়, সঠিক প্রয়োগই এখানে মূল চ্যালেঞ্জ।
এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপ। প্রথমত, সব গুমের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। অভিযুক্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সংসদীয় ও বেসামরিক নজরদারি জোরদার করা জরুরি। তৃতীয়ত, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আইনি, মানসিক ও আর্থিক সহায়তার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
