১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

দুর্নীতি কি অপ্রতিরোধ্য

অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের মন্তব্যটি কেবল একটি অভিযোগ নয়, এটি বাংলাদেশের সমাজের গভীরতম সংকটের এক নিদারুণ স্বীকারোক্তি। তিনি বলেছেন, একসময় দুর্নীতিবাজরা সামাজিকভাবে ঘৃণিত হলেও এখন তারা পুরস্কৃত হয় এবং সম্মান লাভ করে। দুর্নীতি আজ ‘পুরস্কারের সংস্কৃতি’তে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনাসভার এই বক্তব্য প্রমাণ করে, দুর্নীতি এখন আর কেবল প্রশাসনিক বা আইনি সমস্যা নয়, এটি সমাজের মজ্জাগত নৈতিক অবক্ষয়।
​আলোচনাসভায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হকের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। তাঁরা স্বীকার করেন যে দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে এবং এটি নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করে ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার বা ব্যবস্থাপনায় কার্যকর যোগাযোগের অভাব এবং লোকবলের অপ্রতুলতা হতাশাজনক। যখন হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির পর্যাপ্ত শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না, তখন কেবল আইন দিয়ে এটি নির্মূল সম্ভব নয়।
ড. সালেহউদ্দিনের ভাষায়, এই পচন থামাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য।
​এর বিপরীতে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই কঠিন লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি ক্ষমতায় গেলে সরকারের দুর্নীতির তদন্তে অনুমতি নেওয়ার বিধান বাতিল এবং দুদকের কাজে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেন। এই অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রথম ধাপ হলো প্রাতিষ্ঠানিক হাত শক্তিশালী করা। তাঁর বক্তব্যে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দুর্নীতির প্রভাব; যেমন—মেধার ভিত্তিতে চাকরি না পাওয়া, ব্যবসায় ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়া এবং খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি—এই বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।
​তবে কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকারই যথেষ্ট নয়। দুদকের চেয়ারম্যান যে আহবান জানিয়েছেন, অপরাধীদের সীমান্ত পার হতে যাঁরা সাহায্য করেছেন, সেই রাজনৈতিক এলিটদের ভোট না দেওয়ার, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি একটি দ্বিমুখী সমস্যা : একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অন্যদিকে সামাজিক সম্মতি।
​দুর্নীতির এই সংস্কৃতি বদলাতে হলে শুধু শাস্তির ওপর নির্ভর না করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। জনগণের হাতেই সেই ক্ষমতা আছে, যা দুর্নীতিকে সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে। সৎ ও নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমেই কেবল এই ‘পুরস্কারের নতুন সংস্কৃতি’র অবসান ঘটিয়ে দেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়