কেউ অমর নয়। জন্ম ও মৃত্যুর অমোঘ নিয়মে পৃথিবীতে মানুষ আসে ও যায়। কিন্তু এরই মধ্যে কেউ কেউ তাঁর কর্ম, আচরণ ও ত্যাগের বিনিময়ে মানুষের ভালোবাসা কুড়ান, অন্তরে স্থান করে নেন। কেউ বা নিন্দিত হন।খালেদা জিয়া প্রথমোক্তদের শীর্ষে ছিলেন। তাই তাঁর মৃত্যুতে দেশের মানুষ শোকে মুহ্যমান। বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ নেতাসহ অগণিত মানুষ শোকাভিভূত। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হচ্ছে তিন দিনের শোক।তাঁর দল বিএনপি পালন করছে সাত দিনের শোক। আর এভাবেই বেগম জিয়া সম্মান ও গৌরবের শীর্ষ আসনে আসীন হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও সংলগ্ন মানিক মিয়া এভিনিউয়ে। লাখো মানুষের সমাগমে কানায় কানায় পূর্ণ ছিল সেই স্থান।সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে হাসপাতাল থেকে নেওয়া হয় গুলশানের নিজ বাসভবন ফিরোজায়। সেখান থেকে একই মর্যাদায় নেওয়া হয় জানাজার স্থলে এবং জানাজা শেষে নেওয়া হয় সংসদ ভবনের পাশে জিয়া উদ্যানে। সেখানে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ অনেক বিশ্বনেতা। তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এবং জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও পাকিস্তানের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক।
উপস্থিত হন ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মালদ্বীপের একজন মন্ত্রী। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে রাখা শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন চীন, ভারত, পাকিস্তান, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তারা। ঢাকাস্থ জাতিসংঘ অফিস ও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস শোক প্রকাশ করেছে।
এক গৌরবময় জীবনের অধিকারী ছিলেন খালেদা জিয়া। তাঁর আপসহীন সংগ্রামী রাজনৈতিকজীবনের পথচলা শুরু আশির দশকে। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক শাহাদাতবরণের পর যখন দল ও দেশ এক চরম সংকটে, তখন তিনি বিএনপির রাজনীতিতে আসেন। তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি মানুষের অধিকার আদায়ে কাজ করে গেছেন। ওই সময় বহুবার তাঁকে গৃহবন্দি করা হলেও কখনো তিনি আপস করেননি। ১৯৯০-এর ডিসেম্বরে তাঁর সেই অনড় অবস্থানের কাছেই নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল স্বৈরাচার।আমাদের সৌভাগ্য যে তাঁর মতো অবিচল আপসহীন প্রত্যয়ী একজন দেশনেত্রীকে আমরা পেয়েছি। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও দেশাত্মবোধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অনিঃশেষ প্রেরণা ও পাথেয় হয়ে থাকবে। সুদীর্ঘ রাজনৈতিকজীবনে তাঁকে অনেক চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়েছে। অনেক দুঃখ-কষ্ট, নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। এভাবেই তিনি ঠাঁই করে নিয়েছেন ১৮ কোটি মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়।অন্তিমযাত্রায় লাখো কোটি মানুষের অশ্রুসিক্ত যে ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন, পৃথিবীর ইতিহাসের তার দৃষ্টান্ত বিরল। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও পথকে এগিয়ে নিতে হবে, আর সেটিই হবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের সর্বোত্তম পথ।

