দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নশ্বর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। সব মানুষই তা নেয়। কিন্তু খালেদা জিয়া যা রেখে গেছেন, পৃথিবীতে খুব কম মানুষই তা রেখে যেতে পেরেছে। সেটি হলো মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় সশ্রদ্ধ অবস্থান ও ভালোবাসার আসন।
এর প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর জানাজায়। লাখ লাখ মানুষের এত বিপুল জমায়েত সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। না দেশে, না বিদেশে। অশ্রুসজল চোখে সবাই দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করেছে।অবশেষে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হলো স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে।খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তাঁর শারীরিক উপস্থিতির অবসান হলো, কিন্তু তাঁর আদর্শিক উপস্থিতি আরো সবল হলো। তাঁর দল, ভক্ত ও অনুসারীরা নতুন চেতনায় উজ্জীবিত হলো। মানুষের অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন থাকা ও কল্যাণের রাজনীতি করা ছিল তাঁর আদর্শিক ব্রত।
সম্প্রীতি, সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের রাজনীতি তাঁকে মহান করেছে। খালেদা জিয়া ছিলেন উদারতার প্রতীক। আর এসব কারণেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজ পরিচয়ে প্রোজ্জ্বল হয়েছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক। প্রতিকূলতা, কারাবাস, অসুস্থতা ও রাজনৈতিক সংঘাত—কোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি।
তাঁর চলার পথ রুখে দিতে পারেনি।
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও ছিলেন সমান জনপ্রিয়। খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিয়েছেন দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা। সারা দেশেই মানুষ তাঁর জন্য দোয়া ও প্রার্থনা করেছে। রাজধানীর বাইরে দেশের প্রায় সব জেলা-উপজেলায় গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেসব জানাজায়ও মানুষের বিপুল উপস্থিতি ছিল। রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে বুধবার বিকেল ৩টা ৩ মিনিটে খালেদা জিয়ার জানাজা শুরু হয়। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক খালেদা জিয়ার জানাজা পড়ান। দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-পেশা-নির্বিশেষে সমাজের সব স্তরের মানুষ তাঁর জানাজায় অংশ নিয়েছে। রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ ও সংসদ ভবন এলাকা ছাড়িয়ে জনস্রোত আছড়ে পড়ে চারপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে। প্রবল শীত উপেক্ষা করে জানাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে তিনি কতটা মানুষের হৃদয়ের গভীরে স্থান করে নিয়েছিলেন।
খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও বিশিষ্টজনরা। জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে তাঁকে সমাহিত করা হয়। জানাজার আগে খালেদা জিয়ার জীবন ও কর্ম তুলে ধরে লিখিত বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি উল্লেখ করেন, এই মৃত্যুর দায় থেকে শেখ হাসিনা কখনোই মুক্তি পাবেন না।
আমাদের সৌভাগ্য যে তাঁর মতো অবিচল আপসহীন প্রত্যয়ী একজন দেশনেত্রীকে আমরা পেয়েছি। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও দেশাত্মবোধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অনিঃশেষ প্রেরণা ও পাথেয় হয়ে থাকবে। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও পথকে এগিয়ে নিতে হবে, আর সেটিই হবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের সর্বোত্তম পথ।

