২৮শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ১১ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

শিক্ষক নিয়োগে তাড়াহুড়া

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশের সামগ্রিক প্রশাসনিক মনোযোগ যখন এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় আয়োজনকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৪ হাজারের বেশি সহকারী শিক্ষক নিয়োগের তোড়জোড় জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনের মাত্র দিনদশেক আগে এত বড় একটি নিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের এই অস্বাভাবিক দ্রুততা কি শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো সমীকরণ কাজ করছে—তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গত ৯ জানুয়ারির লিখিত পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক জালিয়াতি ও ডিজিটাল কারচুপির অভিযোগে প্রায় ২০০ জনকে আটক করা হয়েছে। সাধারণ পরীক্ষার্থীদের একাংশ যখন স্বচ্ছতার দাবিতে পরীক্ষা বাতিলের দাবি তুলছেন, তখন সেই বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে তড়িঘড়ি করে মৌখিক পরীক্ষার সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ২৮ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই ভাইভা শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে প্রতিটি জেলার ডিসি ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা নির্বাচন নিয়ে অতি ব্যস্ত সময় পার করছেন, সেখানে তাঁরা নিয়োগের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে কতটা গভীর মনোযোগ দিতে পারবেন? এবারের নিয়োগপ্রক্রিয়া কিছু মৌলিক পরিবর্তন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০ থেকে কমিয়ে ১০ করা, সনদের ওপর নম্বর না রাখা এবং ভাইভায় পাস-ফেল প্রথা চালু করা হয়েছে।
সাধারণত নিয়োগে অধিকতর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে যখন বিশেষজ্ঞমহলে আলোচনা চলছে, তখন সনদের ওপর নম্বর তুলে দেওয়ার মতো ‘বিরল’ সিদ্ধান্ত অভিজ্ঞমহলে বিস্ময় জাগিয়েছে। অনেকেরই আশঙ্কা, নজরদারি যখন নির্বাচনের দিকে, তখন এই সুযোগে নিয়োগ বাণিজ্যের সিন্ডিকেটগুলো সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। জেলা প্রশাসকদের অনুপস্থিতিতে তাঁদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তড়িঘড়ি করে ভাইভা নেওয়ার ফলে নিয়োগের মান ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের যুক্তি হলো, তারা দ্রুত নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চায়। কিন্তু নিয়োগের ক্ষেত্রে গতির চেয়ে ‘শুদ্ধতা’ এবং ‘জনগণের আস্থা’ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের আগমুহূর্তে কোনো বিশেষ মহলের স্বার্থসিদ্ধির সুযোগ যেন তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। অতীতে নিয়োগ নিয়ে নানা অনিয়মের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। তাই এই নিয়োগপ্রক্রিয়াকে সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা প্রয়োজন।
শিক্ষকরাই আগামীর ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর।
সেই কারিগর নির্বাচনে যদি স্বচ্ছতা নিয়ে সামান্যতম সংশয় থাকে, তবে তা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই আমরা মনে করি, নিয়োগের এই ‘অস্বাভাবিক তাড়াহুড়া’ বন্ধ করে প্রয়োজনে নির্বাচনের পর পূর্ণ মনোযোগের সঙ্গে এবং কঠোর তদারকিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা উচিত। কোনো মহলের ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বলি যেন মেধাবী চাকরিপ্রার্থীদের না হতে হয়।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়