জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। বাকি আর মাত্র ৯ দিন। সাধারণত এই সময়ে দেশব্যাপী একটি উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। এবার সেই পরিবেশের কিছুটা ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। মানুষের মাঝে এক ধরনের ভয় ও আতঙ্ক কাজ করছে। আর তার অন্যতম কারণ হচ্ছে অবনতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। যেমন বাড়ছে খুন-সন্ত্রাসসহ সাধারণ অপরাধ, তেমনি বাড়ছে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ড। গতকাল প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩ মাসে সারা দেশে শুধু রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৪৬ জন নিহত হয়েছেন। প্রার্থী, সম্ভাব্য প্রার্থী, দলীয় কর্মী-সমর্থক অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৫ দিনে সারা দেশে ১৪৪টি নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে ৫৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ভীতি প্রদর্শন ও আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ঘটেছে ১১টি, প্রার্থীর ওপর আক্রমণের ঘটনা ছয়টি এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার দুটি। এর বাইরে প্রচারকাজে বাধা প্রদানের ঘটনা ১৭টি, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট অফিস ও প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা আটটি, অবরোধ-বিক্ষোভের মতো ঘটনা ১০টি, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা একটি এবং অন্যান্য ঘটনা ২৪টি। সর্বশেষ গত শুক্রবারও নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় দুটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হন অন্তত ১০ জন। পুলিশ ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বলছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ৬৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০ জন নিহত এবং ৫৫৫ জন আহত হয়েছেন।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলোকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। ভোটের মাঠে বিদ্যমান আতঙ্ক দূর করতে হবে। এদিকে রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি অন্যান্য অপরাধ কর্মকাণ্ডও দ্রুত বাড়ছে। প্রতিনিয়ত খুনাখুনি বা লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। পুলিশ, মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) ও আসক এবং হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে প্রতিদিনই একাধিক ব্যক্তি খুন হয়েছেন। গতকালের কালের কণ্ঠ অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাতে নরসিংদীর বেলাব উপজেলায় এক সাবেক ছাত্রলীগ নেতার বস্তাবন্দি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। রাজশাহীতে স্ত্রীর লাশসহ এক সাংবাদিককে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। আরো দুই জেলায় দুই হত্যাকাণ্ড ঘটে ও দুই লাশ উদ্ধার করা হয়।
জানা গেছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য এবার নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করবেন। ভোটের চার দিন আগে থেকে এই বিশাল বাহিনী মাঠে নামবে। তবে এর আগেই সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিশেষ অভিযান চলছে। কিন্তু তার পরও দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বেড়েই চলেছে, যা নিয়ে প্রবল আশঙ্কা প্রকাশ করছেন নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ সহিংসতার আশঙ্কায় বাংলাদেশে অবস্থানরত তাদের নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করেছে।
আমরা আশা করি, আসন্ন নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যে প্রশাসন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ভীতিকর পরিবেশ কোনোভাবেই কাম্য নয়।

