৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

অন্তর্বর্তী সরকারের অযৌক্তিক কর্মকাণ্ড

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে অথবা বলা যায় শেষ মুহূর্তে রাষ্ট্রের বড় বড় কেনাকাটা আর চুক্তির রীতিমতো হিড়িক পড়ে গেছে। অর্থনীতিবিদ, রাজনীতি বিশ্লেষক বা প্রায় কেউই বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখছেন না। তাঁদের মতে, তফসিল ঘোষণার পর যেখানে সরকারের ‘রুটিন কাজ’ চালিয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে বিপুল অঙ্কের এসব চুক্তি ও ব্যয়বহুল প্রকল্প অনুমোদন কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। তাঁরা মনে করেন, সরকারের এসব কর্মকাণ্ড নির্বাচিত সরকারকে বড় ধরনের চাপে ফেলতে পারে। গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, যেসব চুক্তি রাজনৈতিক সরকারের করার কথা, সেগুলো তড়িঘড়ি করে অন্তর্বর্তী সরকারই সম্পন্ন করে যাচ্ছে। চীন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে নৌযান ক্রয়ের চুক্তি, ৩৭ হাজার কোটি টাকায় ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়সহ নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি, নতুন বৃহৎ প্রকল্প অনুমোদন—একের পর এক করে যাচ্ছে সরকার। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এক লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রস্তাবিত নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের চাপ, বিপুল বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও খেলাপি ঋণের বোঝা। ভঙ্গুর অর্থনীতির এমন বাস্তবতা নির্বাচিত সরকারকে শুরুতেই এক কঠিন অবস্থার মুখোমুখি করবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি। তফসিল ঘোষিত হয় গত ১১ ডিসেম্বর। অথচ ডিসেম্বরের প্রথম ২৫ দিনেই তড়িঘড়ি করে এক লাখ ছয় হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ের ৬৪টি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৭৯ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকার ৪০টি প্রকল্পই সম্পূর্ণ নতুন।
অতীতে রাজনৈতিক সরকারের সময়ও নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সাধারণত একনেক সভা বন্ধ থাকত। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এই সময়েও একনেক সভা চালিয়ে গেছে এবং প্রায় প্রতিটি সভায়ই একাধিক মেগাপ্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাস্তাঘাট বা গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মতো এমন কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যা একটি বিশেষ দল বা দলটির প্রার্থীদের নির্বাচনী সুবিধা দিয়েছে। নির্বাচনের দিন দুয়েক আগেও অন্তর্বর্তী সরকারের এ ধরনের কার্যক্রম চলেছে। গতকাল সোমবারও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যচুক্তি সম্পাদিত হওয়ার কথা ছিল।
আগে স্বাক্ষরিত একটি ‘নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর কারণে এই চুক্তির শর্তাবলিও গোপন রাখা হয়েছে। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানিয়েছেন, অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল ওয়াশিংটনে চুক্তি সই অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশ নেবে। এর আগের দিন রবিবার বাংলাদেশ চীন থেকে চারটি নতুন জাহাজ কেনার ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি সই করেছে। মোট ব্যয় ২৪ কোটি ১৯ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার। একই দিনে নৌ সদর দপ্তরে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে জিটুজি ভিত্তিতে একটি ‘অব দ্য শেলফ’ হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল কেনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে বড় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া অযৌক্তিক। নির্বাচন-পরবর্তী যে সরকার আসবে, তার অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত করে যাচ্ছে।’ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘যে চুক্তিগুলো জরুরি নয় এবং দীর্ঘমেয়াদি, সেগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের এড়িয়ে যাওয়া উচিত ছিল।’
আমরা মনে করি, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল দ্রুততম সময়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে দায়িত্ব দেওয়া এবং সে সরকারের চলার পথকে যথাসম্ভব সুগম করা। কিন্তু বাস্তবে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নির্বাচিত সরকারের কাঁধে বিপুল বোঝা চাপানোর মতোই হয়েছে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়