মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট তীব্র হচ্ছে। পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। অনেক কারখানায়, সেচযন্ত্রে জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়, তাদেরও সংকটে পড়তে হয়েছে। বন্দরে পণ্য খালাস থেকে শুরু করে দেশব্যাপী পণ্য পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে পণ্যমূল্যে। ক্রমে পণ্যপ্রাপ্তিতেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানি তেলের খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ জন্য আমদানির ন্যূনতম প্রবাহ ধরে রাখতে হবে এবং বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়াতে হবে।বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, দেশে জ্বালানি তেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জ্বালানি তেল ব্যবহার ছিল প্রায় ৫৫ লাখ মেট্রিক টন। সেটি এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৫ লাখ মেট্রিক টনে। আর এর ৯২ শতাংশই আমদানি করতে হয়। বর্তমানে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই ডিজেল, যা কৃষি, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি ব্যবহৃত হয়। বাকি ৩০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে পেট্রল, অকটেন, কেরোসিন, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডিজেলের ব্যবহার অতি প্রয়োজনীয়, এখানে ব্যবহার কমানোর খুব বেশি সুযোগ নেই। তাই যেকোনো মূল্যে ডিজেল আমদানির প্রবাহ কাছাকাছি পর্যায়ে ধরে রাখতে হবে।সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশে বড় আকারে জ্বালানি তেল মজুদ রাখার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বিশ্বের অনেক দেশ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি তেল মজুদ রাখে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই তুলনায় মজুদ সক্ষমতা অনেক কম। বর্তমানে দেশে গড়ে ৪০ দিনেরও কম সময়ের মতো জ্বালানি তেল মজুদ করা যায়, যা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী খুবই কম। বিপিসির অধীন ২৭টি ডিপো এবং রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির ট্যাংকগুলোতেই মূলত এই মজুদ রাখা হয়। সে কারণে বিশ্ববাজারে কোনো কারণে সংকট তৈরি হলে দ্রুত বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়ে যায়। আবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম খুব কমে গেলেও অনেক দেশ কম দামে তেল কিনে বড় মজুদ গড়ে তোলে, বাংলাদেশ সেই সুবিধাও নিতে পারে না। বাংলাদেশে যেহেতু প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়ে, তাই মজুদ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে ভাবা দরকার।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ডিজেলসংকটের কারণে লাইটারেজ (পণ্যবাহী ছোট) জাহাজগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আমদানিকারক ও জাহাজ মালিকরা বলছেন, আগামী দু-এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বহির্নোঙরে পণ্য খালাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে শিল্প কাঁচামাল থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়তে পারে।
আমরা আশা করি, সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার সংকট মোকাবেলায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বিশেষ করে জরুরি ক্ষেত্রগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুবিধা বাড়াতে হবে।

