২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

যশোর-কুষ্টিয়াসহ খুলনায় বিভাগে হাম আতঙ্ক ৪৮ ঘণ্টায় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ১৪৪ শিশু

সুন্দর সাহা
খুলনায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে শিশু ভর্তির সংখ্যা বাড়ছে। জ্বর, সর্দি-কাশি ও নিউমোনিয়াসহ হামের লক্ষণ নিয়ে বিভাগের ১০ জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ১৪৪ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। হঠ্যাৎ করে হামের রোগী বেড়ে যাওয়ায় অভিভাবকরা আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত এ রোগে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার (২৯ মার্চ) ও সোমবার ৩০ মার্চ এই দুই দিনে আক্রান্তদের শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৩০ মার্চ শনাক্ত হয় ৬৬ জন। ওইদিন যশোরে ১০ জন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪ জন, কুষ্টিয়ায় ৪৭ জন, মাগুরায় ৩ জন এবং মেহেরপুর ও নড়াইলে ১ জন করে শিশু আক্রান্ত হয়। এর আগের দিন ২৯ মার্চ শনাক্ত হয় ৭৮ জন।
এদের মধ্যে কুষ্টিয়ায় ৬৩ জন, যশোরে ৬ জন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩ জন, মাগুরায় ২ জন, সাতক্ষীরায় ১ জন এবং ঝিনাইদহে ২ জন শিশু আক্রান্ত হয়। খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. মুজিবুর রহমান জানান, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে সন্দেহজনক হামের রোগী ভর্তি হচ্ছে এবং বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। হামের চিকিৎসার জন্য বিশেষ নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি বিভাগের পাশে পৃথক ‘হাম কর্নার’ চালু করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে চারজন শিশুকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ভর্তি থাকা শিশুদের মধ্যে তিনজনের বয়স এক বছরের কম এবং তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আইনুল ইসলাম বলেন, আক্রান্ত শিশুদের অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। নতুন রোগী এলে প্রয়োজন অনুযায়ী মীরের ডাঙ্গা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হবে এবং প্রয়োজন হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার করা হবে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা পেলে হাম থেকে সুস্থ হওয়া সম্ভব। তাই অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
যশোরেও হামের প্রাদুর্ভাবের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত দুই মাসে যশোরের দুটি হাসপাতালে হামের লক্ষণ নিয়ে দুই শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে মার্চ মাসে দশ শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত শিশুরা হামের টিকা নেয়নি বলেও প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে। এ কারণে হামের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতাল বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে যশোরের স্বাস্থ্য বিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত দুই মাসে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালে দুই শতাধিক শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। রোববার যশোর শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর চাপ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যহারে। শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের দীর্ঘ সারি। কেউ এসেছেন হাম শনাক্ত করতে, কেউ আবার বসন্ত সন্দেহে পরীক্ষা করাতে। শিশু হাসপাতালের ওয়ার্ড ইনচার্জ সাইদা সুলতানা জানান, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। হামের লক্ষণ নিয়ে প্রতিদিনই নতুন রোগী আসছে। দুই মাসে অন্তত ৯০ জন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অনেক শিশুর হাম রুবেলা টিকা গ্রহণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. সৈয়দ নূর-ই হামিম বলেন, হাসপাতালে টিকার কোনো সংকট নেই। তবে অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণেই শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়ছে। সচেতনতা বাড়ানো গেলে এ হার কমানো সম্ভব। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের রেজিস্ট্রার ডা. আফসার আলী জানান, গত তিন মাসে ৪৫ জন শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল ও তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তিনি বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার পরও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা গবেষণা করছেন।’ যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, যশোরেও হামের প্রাদুর্ভাবের শঙ্কা দেখা দেওয়ায় স্বাস্থ্যবিভাগ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার সকল সরকারি হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের জ্বরসহ শরীরে র্যাশ বা ঘামাচির মতো দেখা গেলে শিশুদের স্কুলে পাঠানো থেকে বিরত থাকা এবং হাসপাতাল বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য অভিভাবকদের অনুরোধ করা হয়েছে। ডা. নাজমুস সাদিক উল্লেখ করেন, শিশুদের হামের টিকা ১০ মাস ও ১৫ মাসে দেওয়া হয়। ফলে অনেক শিশু দশ মাস বয়সের আগে অর্থাৎ টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। হামের প্রধান লক্ষণ হলো উচ্চমাত্রার জ্বর (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত), তীব্র কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া ও সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা যাওয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য তিনি অভিভাবকদের আহ্বান জানান। যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। চলতি মাসে (মার্চ) ল্যাব পরীক্ষায় দশটি শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া অনেক শিশুই হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। যশোরে হামের টিকার কোনো ঘাটতি নেই উল্লেখ করে সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
যশোর-কুষ্টিয়াসহ খুলনা বিভাগে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব। গত কয়েকদিনে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্যখাতে। ইতোমধ্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩ শিশু গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে। খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার (২৯ মার্চ) ও সোমবার ৩০ মার্চ এই দুই দিনে আক্রান্তদের শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৩০ মার্চ শনাক্ত হয় ৬৬ জন। ওইদিন যশোরে ১০ জন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪ জন, কুষ্টিয়ায় ৪৭ জন, মাগুরায় ৩ জন এবং মেহেরপুর ও নড়াইলে ১ জন করে শিশু আক্রান্ত হয়। এর আগের দিন ২৯ মার্চ শনাক্ত হয় ৭৮ জন। এদের মধ্যে কুষ্টিয়ায় ৬৩ জন, যশোরে ৬ জন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩ জন, মাগুরায় ২ জন, সাতক্ষীরায় ১ জন এবং ঝিনাইদহে ২ জন শিশু আক্রান্ত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সতর্কতা জোরদার করার পাশাপাশি শিশুদের টিকাদানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন চিকিৎসকরা। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, তিনজন শিশু গুরুতর অবস্থায় আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি রয়েছে। এদের ৮ মাস, ৭ মাস এবং ৫ মাস বয়সি এই তিন শিশুর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ফেইল করায় তাদের অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছে শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডাঃ সৈয়দা রুখশানা পারভীন। এছাড়া খুলনা বিভাগের সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত হয়েছে কুষ্টিয়ায়। কুষ্টিয়া হাসপাতালে ও যশোর সদর হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে সব থেকে বেশি আক্রান্ত হয়েছে নবজাতক থেকে ৬ মাসের মধ্যে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, আক্রান্ত বেশিরভাগ শিশুর বয়স ৬ মাস থেকে ৫ বছরের মধ্যে। তাদের মধ্যে উচ্চ জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ার মতো জটিলতাও দেখা দিচ্ছে, যার কারণে কিছু শিশুকে আইসোলেশন ইউনিটে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে কয়েকজনকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় হাসপাতালে আক্রান্ত শিশুদের আলাদা ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান সৈয়েদা রুখশানা পারভীন বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু হাঁচি-কাশির মাধ্যমে সহজেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যে-সব শিশু নিয়মিত টিকা পায়নি বা অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের ঝুঁকি বেশি। তিনি আরও বলেন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সহ অন্যান্য হাসপাতালে হামসহ সংক্রামক রোগে আক্রান্তদের ভর্তি করা হয় না। কিন্তু এই রোগের গুরুত্ব বিবেচনায় ও খুলনায় যে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালটি রয়েছে, তার সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে আমাদের এখানে (খুমেক হাসপাতলে) নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি আইসোলেশন সেন্টার তৈরি করে সেখানে তিনটি শিশুকে রাখা হয়েছে। কিন্তু তিনটি শিশুর অবস্থাই খুবই সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এই মুহূর্তে সরকারের ব্যাপকভাবে একটি ভ্যাকসিনেশন ব্যবস্থা চালু করা দরকার। এদিকে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের বরাতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু গবেষণায় তারা দেখতে পাচ্ছিলেন যে নয় মাস বয়সের আগেই শিশুরা হাম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অথচ সম্প্রসারিত টিকাদান বা ইপিআই কর্মসূচিতে শিশুদের প্রথম এই টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে। সে কারণে অনেকে হামের টিকার সময়সীমা এগিয়ে আনার পক্ষে মত দিচ্ছেন। আবার এতদিন ধরে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত যে ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছিল, তার মান ঠিক আছে কি-না তা নিয়েও উদ্বেগ আছে অনেকের মধ্যে। শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার দে বলছেন, ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে হামের লক্ষণ দেখা যায়। আর একজন হাম আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে আরও অন্তত ১৮ জন সংক্রমিত হতে পারে। এর প্রথম পর্যায়ে অনেক জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল ও আলো সহ্য করতে না পারা (চোখ ওঠা)র মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এটি একটি ভাইরাল ও খুবই ছোঁয়াচে রোগ। এতে আক্রান্ত হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। তখন শিশু নিউমোনিয়া ও লুজ মোশনে আক্রান্ত হতে পারে। আবার এসব হলে পুষ্টিহীনতা দেখা দেয়। সব মিলিয়ে শিশুর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে এই রোগ, বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি। চিকিৎসকদের মতে, বেশির ভাগ সময় হামে আক্রান্ত শিশুকে হাসপাতালে আলাদা ব্যবস্থাপনায় রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। সব আইসিইউতে এসব রুগীকে চিকিৎসা দেওয়া যায় না। তাই আলাদা করে আইসিইউর ব্যবস্থা করা হচ্ছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে।

 

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়