চব্বিশের গণ-আন্দোলনের মুখে কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ছাত্রনেতাদের হাত ধরে ক্ষমতায় আসেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। অনেকেই আশা করেছিলেন, রাষ্ট্রের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা দূর হবে। নাগরিক হিসেবে প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত হবে। কিন্তু কোথায় কী! অভিযোগ রয়েছে, মাত্র দেড় বছরে মুহাম্মদ ইউনূস ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলে বহু পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। আইনজ্ঞরা বলছেন, সরকারের সর্বোচ্চ পদে বসে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সংবিধান পরিপন্থী।গতকাল প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে।খবরে বলা হয়েছে, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের’ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী ‘প্রস্তাবিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে সংরক্ষিত তহবিল হিসেবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য অন্যূন পাঁচ কোটি টাকা, অন্যান্য মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য তিন কোটি টাকা এবং অন্যান্য এলাকার জন্য দেড় কোটি টাকা যেকোনো তফসিলি ব্যাংকে জমা থাকতে হয়।’ কিন্তু গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এই নিয়ম মানা হয়নি।নথিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাসের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে দিয়াবাড়ী, যা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় পড়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তফসিলি ব্যাংকে পাঁচ কোটি টাকা জমা হওয়ার কথা, কিন্তু সেখানে মাত্র দেড় কোটি টাকার হদিস পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এর আগে ২২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকলেও সেগুলো টপকে মাত্র তিন মাসেই গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় বসেই যেসব সুবিধা নিয়েছেন তার মধ্যে অন্যতম জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতেই প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে লাইসেন্স পায় গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস লিমিটেড।
মার্চের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি বায়রার সদস্য পদও লাভ করে। জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানটির ৯০ শতাংশ শেয়ার ইউনূস সেন্টারের। এ ছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক গেজেটের মাধ্যমে পাঁচ বছরের জন্য গ্রামীণ ব্যাংককে আয়কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত হীন স্বার্থে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের নজির আরো রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেছেন, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে ছিলেন। উনি ব্যক্তিগত স্বার্থে এই পদকে (প্রধান উপদেষ্টা) ব্যবহার করেছেন। শুধু তা-ই নয়, কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টে উনি দায়ী হয়ে গেছেন। এসব কাজের মধ্য দিয়ে তিনি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ ভঙ্গ করেছেন। আর সবকিছু মিলে তিনি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।’ সুপ্রিম কোর্টের আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, ‘সংবিধানের ১৪৭ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি সাংবিধানিক পদে থাকাকালে কোনো লাভজনক কাজে নিয়োজিত হতে পারবেন না। ড. ইউনূস তাঁর নিজের বা নিজের কর্তৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দিয়ে সংবিধানের ১৪৭ ধারার বরখেলাপ করেছেন।’
ড. ইউনূস এখন ক্ষমতায় নেই, কিন্তু তাঁর কর্মকাণ্ডের ফল এখনো রয়েছে। আমরা মনে করি, যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, এগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার। প্রয়োজনে তাঁকে আইনের আওতায় আনতে হবে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসে যেকোনো অনিয়মের দায় কেউ এড়াতে পারেন না।

