৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত সাতক্ষীরার জনজীবন

আব্দুল আলিম, সাতক্ষীরা
সাতক্ষীরায় তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ছবি-জাগো নিউজ বৈশাখের শুরুতেই তীব্র দাবদাহে পুড়ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। প্রখর রোদ আর দমবন্ধ করা গরমে হাঁসফাঁস করছে জনজীবন। এ অবস্থায় দুর্ভোগ বাড়িয়েছে লোডশেডিং। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। উৎপাদন ও সরবরাহ সীমিত থাকায় লোড ম্যানেজমেন্টের অংশ হিসেবে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী বলেন, ‌‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা এখন মানুষের সহনীয় সীমা অতিক্রম করছে। একসময় ফ্যানের বাতাসেই স্বস্তি মিলতো, এখন এসির বাতাসেও তেমন আরাম পাওয়া যায় না। সাতক্ষীরায় তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারগুলোও বাধ্য হয়ে এসির দিকে ঝুঁকছে, যা আর বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’তিনি আরও বলেন, ‘বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে এ অঞ্চলের আবহাওয়া অনেকটাই মধ্যপ্রাচ্যের মতো হয়ে উঠছে। ফলে শিশুদের মধ্যে ভাইরাসজনিত রোগ ও চর্মরোগের প্রকোপ বাড়ছে।’ এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ঘন ঘন লোডশেডিং জনজীবনকে করে তুলেছে অসহনীয়। দিন-রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শহর থেকে গ্রাম—সব শ্রেণিপেশার মানুষ। সাতক্ষীরা শহরের ইটাগাছা এলাকার বৃদ্ধ আব্দুল গফুর তীব্র গরমে বিদ্যুৎ সংকটকে চরম দুর্ভোগ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গরমে বিদ্যুৎ না থাকলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। রাতে ঘুমাতে পারেন না, বারবার উঠে বসতে হয়। বয়সের ভারে এমন কষ্ট সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই এলাকার পলাশপোলের গৃহিণী শারমিন আক্তার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঘরে ছোট শিশু থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে শিশুরা কান্নাকাটি করে, গরমে অস্থির হয়ে পড়ে। ফ্যান ছাড়া ঘরের ভেতর থাকা যায় না।’ কলারোয়া উপজেলার সরসকাটি গ্রামের মোশারফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে চার ঘণ্টাও ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় সারারাতও বিদ্যুৎ থাকে না।’ শহরের একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে রাখা পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সময়মতো বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। ক্রেতাও কমে গেছে। প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে।’ শ্যামনগরের কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘সেচের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ না পাওয়ায় জমিতে সময়মতো পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে ফসল ক্ষতির মুখে পড়ছে। কৃষিকাজে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’ বিদ্যুৎ না থাকলে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালানোর সুযোগ থাকলেও ডিজেল ও পেট্রোলের সংকটে সেটিও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে লেদ কারখানা, মোটর গ্যারেজ, দুগ্ধ খামার, মিষ্টি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, কৃষি সেচ, মাছের ঘেরে এরোটার, হ্যাচারি ও অটো রাইস মিল—সবখানেই কাজ থমকে যাচ্ছে। একটি লেদ কারখানার মালিক সাইদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অর্ডার সময়মতো দেওয়া যাচ্ছে না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, ডিজেল সংকটের কারণে জেনারেটর চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক সময় সেবা সীমিত করতে হচ্ছে। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সোয়াইব হোসেন জানান, পিক আওয়ারে সাতক্ষীরায় বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে প্রায় ২২ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ১৫-১৬ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন গড়ে ৭-৮ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় লোড ম্যানেজমেন্টের অংশ হিসেবে শহরের ১২টি ফিডারের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম মো. আজিজুর রহমান সরকার জানান, জেলায় তাদের মোট গ্রাহক ছয় লাখ ৪৭ হাজার ২৪ জন। বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে প্রায় ১৫০ মেগাওয়াট। তবে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৯৫ মেগাওয়াটের মতো। এতে গ্রাহকের পূর্ণ চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।

 

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়