সারা দেশে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে শিশুদের মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ নানা পদক্ষেপ নিলেও তা যে পর্যাপ্ত নয়, প্রতিদিনের শিশুমৃত্যু ও নিঃস্ব মায়েদের আহাজারি আমাদের তা বলে দিচ্ছে। গতকাল পর্যন্ত সরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১৫। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঠের পরিস্থিতি এর চেয়েও ভয়াবহ; অর্থাৎ হামে আক্রান্ত রোগীর প্রকৃত সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা আমাদের অজানাই থেকে যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন যথার্থই বলেছেন, ‘হাম পরিস্থিতি এখন শুধু একটি সংক্রামক রোগের সংকট নয়, এটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার নগ্ন প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘এখন বেশি আলোচনা হচ্ছে আইসিইউ, পিআইসিইউ, ভেন্টিলেটর ও লাইফ সাপোর্ট নিয়ে।
অথচ একটি শিশুকে এমন অবস্থায় কেন যেতে হচ্ছে, যেখানে ভেন্টিলেটরের প্রয়োজন পড়ছে।’ অর্থাৎ সংকটের মূল জায়গা এখনো আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। আমাদের জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা নেই বললেই চলে। এমনকি বিভাগীয় শহরের হাসপাতালেও চিকিৎসার মান করুণ।
তাই বেশির ভাগ রোগী উন্নত চিকিৎসার আশায় রাজধানীমুখী হয়। কিন্তু রাজধানীতেও চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা কম নয়। গতকাল কালের কণ্ঠের খবরে বলা হয়েছে, আমাদের এখানে নবজাতক ও প্রাপ্তবয়স্কদের আইসিইউ সেবা থাকলেও বাড়ন্ত শিশুদের জন্য এই সেবা অত্যন্ত অপ্রতুল। এ কারণে আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে অভিভাবকদের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। খবরে বলা হয়েছে, ভেন্টিলেশন সেবা পেতেই আক্রান্ত শিশুদের জীবনীশক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়।
হাম পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থায় উদ্বিগ্ন না হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু অনেক সময় অতিরিক্ত আতঙ্ক পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া দরকার। শিশুর জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা হামের উপসর্গ দেখা দিলে যদি প্রথমেই দ্রুত স্থানীয় পর্যবেক্ষণে নেওয়া হয়, তাহলে হয়তো অনেকের জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে শুধু ভেন্টিলেশন বাড়ানোর চিন্তা যথেষ্ট নয়। একটি ভেন্টিলেটরের খরচে শতাধিক শিশুর জন্য অক্সিজেন সাপোর্ট, পর্যবেক্ষণ ও কমিউনিটিভিত্তিক চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এসব পরামর্শ আমলে নেওয়া দরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার সুফল পেতে আরো সময় লাগবে। কিন্তু তার আগে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। এ পরিস্থিতিকে ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে বিবেচনা করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর একজন মায়ের বুকও যেন খালি না হয়, তা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে।

