মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বা ক্রুড অয়েল আমদানি মূলত এই পথ দিয়েই হতো। তাই হরমুজ বন্ধ হওয়ায় বাংলাদেশে ক্রুড অয়েল আমদানি কার্যত থমকে গেছে। সে কারণে দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) ‘ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন’ বা তেল শোধনও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।বর্তমানে ট্যাংকারে জমে থাকা সামান্য পরিমাণ তলানির তেল বা ‘ডেড স্টক’ দিয়ে কোনোমতে কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা চলছে। অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শোধনাগারটি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, বরং লো-ফিড বা সীমিত উৎপাদনে সচল রয়েছে। গত বুধবার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গত মার্চে নির্ধারিত ক্রুড অয়েলের চালান সময়মতো পৌঁছতে না পারায় ইআরএলকে সীমিত পরিসরে চালু রাখা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে সরকার পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি নিশ্চিত করছে এবং বিকল্প উৎস থেকেও সরাসরি ক্রয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যাতে সরবরাহে কোনো ঘাটতি না হয়।
’ ব্রিফিংয়ে আরো জানানো হয়, ইআরএল মূলত সৌদি আরবের অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মারবান ক্রুড আমদানি করে পরিশোধন করে। বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন জ্বালানি তেল পরিশোধন করে দেশের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করে। অন্যদিকে সরকার পর্যাপ্ত মজুদের কথা বললেও সারা দেশের পাম্পগুলোতে রীতিমতো হাহাকার চলছে। দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষায় থেকে ব্যবহারকারীদের মধ্যে হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। অনেক স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি অবৈধ মজুদ ও কৃত্রিম সংকট পরিস্থিতিকে জটিল করছে। কোথাও কোথাও বেশি দামে তেল বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। এমনকি মুদি দোকানেও ক্যান বা বোতল ভর্তি তেল বেশি দামে বিক্রি হতে দেখা যায়। অনেকে অবৈধভাবে মজুদ করে রাখছে। গত ৩ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুদ করা পাঁচ লাখ ৪২ হাজার ২৩৬ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। অনেককে জেল-জরিমানাও করা হয়েছে। তবু অবৈধ মজুদ গড়ে তোলার প্রবণতা বন্ধ হচ্ছে না।
বর্তমানে পরিশোধিত তেল কেনায় খরচ অনেক বেশি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামও অনেক বেড়েছে। তাই সরকারকে অনেক বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে এবং ভর্তুকির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক সংকটের কারণে অন্যান্য আমদানিতেও ব্যয় অনেক বেড়েছে। প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, ভর্তুকির চাপ সামলাতে নতুন সরকার মাত্র দেড় মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৭৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে একটি উচ্চ পর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট কত দিনে কাটবে বলা কঠিন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুদ্ধ বন্ধ হলেও জ্বালানিসংকট কাটতে সময় লাগবে। তাই সংকট মোকাবেলায় দীর্ঘ প্রস্তুতি রাখতে হবে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। পাশাপাশি তেলের সরবরাহ ও বিক্রয় ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে মজুদদারি ও অবৈধ তেল বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

