১৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ২৮শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

কেশবপুরে হাটে বিক্রি হচ্ছে মানুষ

মাসুম বিল্লাহ, কেশবপুর
হাটে বিক্রি হচ্ছে মানুষ। দরদাম চলছে যেন পণ্যের মতো। প্রথমবার এ কথাটি শুনতে অবাক লাগলেও, এটাই নির্মম সত্য। ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় হাট। চলে সকাল ৮টার আগ পর্যন্ত। নামে মানুষ বিক্রির হাট হলেও এটি শ্রমিক বা কামলার হাট নামে পরিচিত। তবে চিরদিনের জন্য এখানে বিক্রি হয় না মানুষ। একটি দিনের কয়েক ঘন্টা নিজেকে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করাই তাদের পেশা। এই হাটে নিজেকে বিক্রির মাধ্যমে শ্রমের কষ্টার্জিত টাকা দিয়েই চলে এসব মানুষ সংসার। হাটে আসা শ্রমজীবীরা কখনো ভালো দামে নিজেকে বিক্রি করেন আবার কখনো হতাশ হয়ে বাড়ি ফেরেন। তবে চলতি বোরো মৌসুমে এই হাটে আসা শ্রমিকেরা নিজেকে বিক্রি করছেন উচ্চমূল্যে। দেড়মণ ধানের দামে কেনা হচ্ছে একজন কৃষি শ্রমিক। অধিক দামে শ্রমিক কিনতে গিয়ে কৃষকেরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। ১৪০০-১৬০০ টাকায় শ্রমিক কিনতে গিয়ে অনেক কৃষক আগামীতে ধানের আবাদ করবেন না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। যশোরের কেশবপুরের মূলগ্রামে মানুষ বিক্রির হাট ঘুরে এ তথ্য জানা গেছে। সরেজমিন সোমবার ভোরে উপজেলার মূলগ্রাম বাজারে মানুষ বিক্রির হাটে গেলে দেখা যায়, ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শত শত কৃষি শ্রমিক কাঁচি, বাখ-দড়ি নিয়ে বোরো ধানের ক্ষেতে শ্রম দেওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছেন। বোরো মৌসুমে এসব শ্রমিকেরা ধান কাটা, বাধা, বাখে করে কৃষকের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া, ঝাড়াই করা, বিচালী গাদা দেওয়াসহ অন্যান্য কাজ করে থাকেন। শ্রম বিক্রি করতে আসা উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের আব্দুল করিম নামে এক ব্যক্তি বলেন, সকাল ৬টার দিকে কাজ করার জন্য এখানে এসেছেন। বাখে করে ধান বয়ে আনার জন্য ১৬০০ টাকা দাম চেয়েছেন। অন্য সময় ৫০০ টাকার বিনিময়ে শ্রম দিতেন। ধানের মৌসুম হওয়ায় এবার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ওই স্থানে শ্রমিক কিনতে আসা উপজেলার মূলগ্রামের কৃষক আলাউদ্দীন বলেন, এক বিঘা জমির ধান ক্ষেত থেকে বিচালী বেঁধে আনার জন্য ২০ জন শ্রমিক কিনেছেন জনপ্রতি ১৪০০ টাকা দরে। কাজ করবে ৭টা থেকে ১টা পর্যন্ত। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এই স্থানে দূর-দূরান্ত থেকে শ্রমিকেরা শ্রম বিক্রির উদ্দেশ্যে আসেন।
ধান চাষী রুহুল আমিন বলেন, এখানে মানুষ বেচা-কেনা হয়। একদিন বা এক সপ্তাহের জন্য মানুষ বিক্রি হয়। দুই বিঘা জমির ধান কাটার জন্য শ্রমিক কিনতে এসেছেন। জনপ্রতি ১৫০০ টাকা চাচ্ছে। দু’দিন আগে এই হাটে ১৭০০-১৮০০ টাকায় শ্রমিক বিক্রি হয়েছে। ধানের মৌসুম হওয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুণ দামে শ্রমিক কিনতে হচ্ছে। ধান চাষী মফিজুর রহমান বলেন, শ্রমিক কিনতে এসেছিলাম। দাম চাচ্ছে ১৬০০-১৮০০ টাকা। কাটা প্রতি ১ জন শ্রমিক লাগছে। আমরা কৃষক কী করে বাঁচবো। ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ১০০০-১১০০ টাকা। ধানে যদি দাম না বাড়ে আমরা কিভাবে শ্রমিকের টাকা দিব। আমরা কোন পথ খুঁজে পাচ্ছিনে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে ধান আবাদ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। কেশবপুর উপজেলা আড়ৎ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাৎ হোসেন বলেন, তারা মোটা ধান ১০০০ টাকা এবং চিকন ধান ১০৮০ থেকে ১১০০ টাকা দরে কিনছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্ল্যাহ আল মামুন বলেন, কেশবপুর উপজেলায় এবার বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ হাজার ৩৫০ হেক্টর। এ পর্যন্ত ৪০ ভাগ ধান কাটা হয়ে গেছে। কয়েকদিনের ভেতর কৃষকেরা তাদের আবাদকৃত সকল ধান ঘরে তুলতে পারবেন। ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিকদের চাহিদা অধিক থাকায় বেশি দামে শ্রম বিক্রি হচ্ছে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়