ড. মতিউর রহমান
আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে যখন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা কথা বলেন, তখন তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় এক গভীর বঞ্চনা ও নৈতিক অবিচারের আখ্যান। এই ভাষাটি একজন নিরপরাধ ভুক্তভোগীর, যে জাতি বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে নগণ্য ভূমিকা রেখেও জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বিপর্যয়ের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে আছে। এই যুক্তির ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত; বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্র ০.৩ শতাংশের জন্য দায়ী হয়েও ২০২৪ সালের বিশ্ব ঝুঁকি সূচকে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ নবম স্থানে রয়েছে। এই বৈশ্বিক অবিচার দিবালোকের মতো স্পষ্ট এবং এর মানবিক বিপর্যয়ের দলিলও অত্যন্ত দীর্ঘ। তবে এই সুপরিচিত আখ্যানের সমান্তরালে দেশের ভেতরেই অন্য এক নেপথ্য গল্প রচিত হচ্ছে। সেটি হলো জলবায়ু বিপর্যয়কে পুঁজি করে মুনাফা শিকারের গল্প। দুর্যোগের এই অন্ধকার সময়ে একদিকে যখন সাধারণ মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে, অন্যদিকে তখন একদল সুবিধাভোগী এই সংকটকেই রূপান্তর করছে লাভজনক ব্যবসায়।
এই প্রক্রিয়াটিকে খুব সহজে ‘জলবায়ু পুঁজিবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এটি মূলত পরিবেশগত সংকট এবং বাজার ব্যবস্থার এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ, যেখানে জনমানুষের দুর্ভোগ ব্যক্তিগত মুনাফার সুযোগ তৈরি করে। এটি কোনো সুসংগঠিত ষড়যন্ত্র নয়, বরং পুঁজিবাদের চিরাচরিত সহজাত প্রবৃত্তি—যেখানে যেকোনো সংকটই একটি নতুন বাজার, নতুন পণ্য এবং নতুন ক্রেতা তৈরির পথ প্রশস্ত করে। সমকালীন বাংলাদেশে অসহনীয় তাপপ্রবাহ, বিধ্বংসী বন্যা কিংবা ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট এখন আর স্রেফ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এগুলো বৃহৎ পুঁজির কাছে এক একটি উদীয়মান ব্যবসার ক্ষেত্র। আমাদের জাতীয় ও নীতি-নির্ধারণী আলোচনায় এই রূঢ় সত্যটি এখনো উপেক্ষিত যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এই কৃত্রিম অর্থনীতিতে কারা সম্পদশালী হচ্ছে আর কারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এর চরম মূল্য পরিশোধ করছে।
বাংলাদেশের বর্তমান তাপ সংকট কোনো সাময়িক ঋতুভিত্তিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি স্থায়ী কাঠামোগত সংকটে রূপ নিয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৮০ সাল থেকে দেশের গড় তাপমাত্রা ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলেও আর্দ্রতা ও অন্যান্য কারণে অনুভূত তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। উচ্চ তাপমাত্রার ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বিতীয়। বিশেষ করে ঢাকা শহরের তাপ সূচক জাতীয় গড়ের চেয়ে প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে দেশজুড়ে যে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে, তা ছিল এ যাবতকালের সব রেকর্ড ভঙ্গকারী। এই তাপের অর্থনৈতিক অভিঘাত অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। তাপজনিত অসুস্থতার কারণে শুধুমাত্র গত বছরেই দেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১.৭৮ বিলিয়ন ডলার—যা আমাদের মোট জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ। রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক, হকার কিংবা পোশাক শ্রমিকদের মতো শ্রমজীবী মানুষের কাছে এই তাপ স্রেফ অস্বস্তি নয়, বরং এটি তাদের জীবন ও জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত।
অথচ এই অসহ্য উত্তাপই দেশের অর্থনীতির একটি নির্দিষ্ট অংশের জন্য প্রবৃদ্ধির বসন্ত নিয়ে এসেছে। ২০২১ সাল থেকে বাংলাদেশের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি-র বাজারে এক অভাবনীয় জোয়ার দেখা দিয়েছে। ২০২৪ সাল নাগাদ এর বার্ষিক বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা গ্রীষ্মকাল এখন বিলাসপণ্য এসি-কে একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্যে পরিণত করেছে। বাজার ব্যবস্থা এখানে দ্বিমুখী ভূমিকা পালন করছে; যারা সামর্থ্যবান তাদের শীতল থাকার সুযোগ করে দিচ্ছে মুনাফার বিনিময়ে, আর যাদের সামর্থ্য নেই তাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত উষ্ণতার শাস্তি। দেশের মাত্র দুই থেকে তিন শতাংশ পরিবার এসি ব্যবহার করতে পারে, যার অর্থ হলো বিশাল এক জনগোষ্ঠী—যাদের শ্রমে বড় বড় অট্টালিকা শীতল থাকে—তারা নিজেরা পাখা বা সামান্য ছায়াটুকুও পাচ্ছে না। যে জলবায়ু সংকট ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ীদের পকেটে রেকর্ড মুনাফা তুলছে, সেই একই সংকট সাধারণ শ্রমিকের জন্য বয়ে আনছে শারীরিক অবসাদ এবং চরম আয় বৈষম্য।
২০২৪ সালের বন্যা ছিল সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম এক ট্র্যাজেডি, যেখানে ১ কোটি ৮৪ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বন্যা শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস করেনি, বরং লাখ লাখ মানুষকে তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করেছে। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যেখানে দরিদ্রদের জন্য রাষ্ট্রীয় আবাসন ব্যবস্থা বা আইনি সুরক্ষা অত্যন্ত দুর্বল, সেখানে এই বাস্তুচ্যুতি শেষ পর্যন্ত একটি বাজারভিত্তিক পণ্যে পরিণত হয়। প্রতি বছর প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ উপকূলীয় এলাকা থেকে ভাগ্য অন্বেষণে ঢাকা অভিমুখে পাড়ি জমায়। এদের একটি বিশাল অংশই জলবায়ু উদ্বাস্তু। ঢাকার বস্তিগুলোতে বসবাসকারী প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো পরিবেশগত বিপর্যয়ের শিকার হয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন বলছে, ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে।
ঢাকায় আসা এই জলবায়ু উদ্বাস্তুদের প্রতিটি ঢেউ শহরের আবাসন বাজারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। যেহেতু চাহিদা অসীম কিন্তু জোগান সীমিত, তাই অনানুষ্ঠানিক আবাসন বা বস্তিগুলোতে ভাড়ার হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। যমুনা নদীর ভাঙন বা উপকূলের নোনা পানি থেকে বাঁচতে আসা এই নিঃস্ব মানুষগুলো শহরে পা রাখামাত্রই এমন এক বাজারের জালে আটকা পড়ে, যেখানে তাদের কোনো দর কষাকষির ক্ষমতা নেই। তাদের এই বাড়তি খরচের হিসাব কোনো আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলে নথিভুক্ত হয় না। শহুরে জমির মালিকরা এই বর্ধিত চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে তাদের সম্পদ বৃদ্ধি করে চলেছেন, আর নিম্ন আয়ের মানুষগুলো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার জন্য তাদের আয়ের সিংহভাগ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। এই বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর আইনি স্বীকৃতির অভাব তাদের স্থানীয় প্রভাবশালী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শোষণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টা করছে। দেশের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রতি বছর জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ বা ১২.৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। সরকার এই অর্থ সংগ্রহে আন্তরিক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে কাজ করছে। তবে মূল সমস্যাটি লৈঙ্গিক ও শ্রেণিগত বৈষম্যের মধ্যে নিহিত। বর্তমান জলবায়ু অর্থায়নের কাঠামোটি মূলত ‘ব্যাংকযোগ্য’ বা লাভজনক প্রকল্পগুলোর দিকেই বেশি ঝুঁকে থাকে, যা প্রান্তিক মানুষের সরাসরি কোনো উপকারে আসে না। পোশাক শিল্পের ‘সবুজ রূপান্তর’ বা গ্রিন ফ্যাক্টরি এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বাংলাদেশের পোশাক খাতের মালিকরা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাপে সৌর প্যানেল স্থাপন বা লিড-সার্টিফাইড ভবন নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ করছেন। মালিকরা এর বিনিময়ে সহজ শর্তে ঋণ, সরকারি প্রণোদনা এবং বিশ্ববাজারে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু যে ৪৪ লক্ষ শ্রমিক এই শিল্পের প্রাণ, তাদের জীবনমানের কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেনি। কারখানার ভেতরে পরিবেশসম্মত ব্যবস্থা থাকলেও শ্রমিকের যাতায়াত বা আবাসন ব্যবস্থায় জলবায়ু সহনশীলতার কোনো বালাই নেই।
একই বৈষম্য পরিলক্ষিত হয় সবুজ অর্থনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে। গ্রিন বন্ড বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্পগুলো মূলত বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুবিধা দিচ্ছে। যে কৃষকের জমি লবণাক্ততায় তলিয়ে যাচ্ছে কিংবা যে শ্রমিক রোদে পুড়ে কাজ করছে, এই আর্থিক উদ্ভাবনগুলো তাদের স্পর্শ করতে পারছে না। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদন বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার পরিবারগুলো রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়াই নিজেদের সঞ্চয় থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে ৮০ শতাংশ খরচ বহন করছে। এর মানে হলো, দরিদ্ররা নীরবে নিজেদের অভিযোজনের জন্য নিজেরাই অর্থ যোগাচ্ছে—তারা ঘটিবাটি বিক্রি করে উঁচু জায়গায় ঘর বাঁধছে কিংবা ফসল নষ্ট হলে শহরমুখী হচ্ছে। তাদের এই বিশাল ত্যাগের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই, নেই কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ।
জলবায়ু পুঁজিবাদের আরেকটি অন্ধকার দিক হলো অভ্যন্তরীণ কার্বন নিঃসরণের ক্রমবর্ধমান হার। বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে পেশ করলেও দেশের ভেতরে একটি সুবিধাভোগী শ্রেণি দ্রুত নিঃসরণ বাড়িয়ে চলেছে। গত কয়েক বছরে দেশের মোট জ্বালানি সরবরাহে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান এখনো নগণ্য। এই জ্বালানি মূলত শিল্পকারখানা, উচ্চবিত্তের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা এবং বাণিজ্যিক খাতের চাহিদা মেটাচ্ছে। অথচ এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সেই সব মানুষের ওপর, যারা রিকশায় চড়ে বা খোলা আকাশের নিচে কাজ করে এই নিঃসরণে বিন্দুমাত্র ভূমিকা রাখে না। যখনই পরিবেশের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়ে, তখন এই নিম্ন আয়ের মানুষগুলোকেই প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়।
প্রকৃত জলবায়ু ন্যায়বিচার কেবল আন্তর্জাতিক ফোরামে অর্থ দাবি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিতে আমূল পরিবর্তন। ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে যখন শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাপমাত্রার প্রভাব এবং উৎপাদনশীলতার ক্ষতিকে বিবেচনায় নেওয়া হবে। জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য কেবল ত্রাণ নয়, বরং শহরে তাদের নিশ্চিত আবাসন ও মালিকানা স্বত্ব নিশ্চিত করতে হবে। সবুজ শিল্পায়নের সুফল যাতে কেবল মালিকপক্ষ না ভোগ করে, বরং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রায় তার প্রতিফলন ঘটে—এমন শর্তযুক্ত অর্থায়ন প্রয়োজন। আমাদের জাতীয়ভাবে এটি স্বীকার করে নিতে হবে যে, উপকূলের কৃষক বা শহরের বস্তিবাসীই হলেন জলবায়ু পরিবর্তনের আসল যোদ্ধা, যারা সবচেয়ে কম সুবিধা পেয়ে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করছেনবাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে জলবায়ু অবিচার নিয়ে যে জোরালো দাবি তোলে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এখন সময় এসেছে ঘরের ভেতরে তাকানোর। দেশের অভ্যন্তরে জলবায়ু পরিবর্তনের নামে যে পুঁজিবাদের বিস্তার ঘটছে এবং বৈষম্যের যে নতুন দেয়াল তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে সমান স্বচ্ছতার সাথে কথা বলা জরুরি। দুর্যোগকে পুঁজি করে মুনাফা শিকারের এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে জলবায়ু অভিযোজন কেবল একটি শ্রেণিকে আরও ধনী করবে, আর সাধারণ মানুষকে ঠেলে দেবে এক অন্তহীন অন্ধকারের দিকে। প্রকৃত টেকসই উন্নয়ন তখনই সম্ভব হবে, যখন দুর্যোগের মোকাবিলায় আমাদের কৌশলগুলো মুনাফাকেন্দ্রিক না হয়ে মানুষকেন্দ্রিক হবে।
লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।

