১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

কোরবানির পশুর চামড়ার যত্ন নেওয়া কেন জরুরি?

আহসান হাবিব বরুন
ঈদুল আজহা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি ত্যাগ, মানবিকতা, সাম্য ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য শিক্ষা। প্রতি বছর লাখো মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করেন। কিন্তু কোরবানির পর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের অসচেতনতা, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে বারবার সংকটে পড়ে—সেটি হলো পশুর চামড়া সংরক্ষণ। অথচ এই চামড়া শুধু একটি উপজাত নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, এতিম-মিসকিনের অধিকার, শিল্পখাতের ভবিষ্যৎ এবং বৈদেশিক আয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি জাতীয় সম্পদ।বাংলাদেশে কোরবানির ঈদের সময় লাখ লাখ পশু জবাই হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয়, যা দেশের চামড়া শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। এই শিল্প বহু বছর ধরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—অসচেতনতা, সঠিক সংরক্ষণের অভাব, পরিবহন জটিলতা, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ, মৌসুমি ব্যবসায়ী, এতিমখানা-মাদরাসা এবং পুরো অর্থনীতি।
কোরবানির চামড়া জাতীয় সম্পদ। সঠিক নিয়মে চামড়া সংরক্ষণ না করলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই এ বছর সরকার চামড়া সংরক্ষণে বিনামূল্যে লবণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক উদ্যোগ।
কারণ কোরবানির পরপরই সঠিকভাবে লবণ ব্যবহার করতে না পারায় বিপুল পরিমাণ চামড়া পচে যায় কিংবা মান হারায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত পরিমাণে লবণ ব্যবহার করে চামড়া সংরক্ষণ করা গেলে এর গুণগত মান অক্ষুণ্ণ থাকে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও ন্যায্যমূল্য পাওয়া সম্ভব হয়।চামড়ার সংরক্ষণে সচেতনতা যত বাড়বে, তত কমবে অপচয় এবং লাভবান হবে দেশের অর্থনীতি, এতিমখানা-মাদরাসা ও চামড়া শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লাখো মানুষ। তাই শুধু সরকার নয়, সাধারণ মানুষকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা যেমন ত্যাগ ও মানবিকতা, তেমনি এর সঙ্গে সম্পদের সঠিক ব্যবহারও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
কোরবানির চামড়া নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা শুরু হয় জবাইয়ের পরপরই। অনেকেই জানেন না, একটি পশুর চামড়া ঠিকমতো সংরক্ষণ না করলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা নষ্ট হতে শুরু করে। চামড়ায় পর্যাপ্ত লবণ না দেওয়া, ভেজা স্থানে ফেলে রাখা, রোদে অতিরিক্ত শুকানো বা দীর্ঘ সময় অযত্নে রাখা—এসব কারণে চামড়ার গুণগত মান কমে যায়। একসময় যে চামড়া আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান পণ্য হিসেবে বিবেচিত হতো, সেটি তখন প্রায় অমূল্য হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কোরবানির চামড়া এতিমখানা ও মাদরাসার আয়ের অন্যতম উৎস হিসেবে পরিচিত। সাধারণ মানুষ ধর্মীয় আবেগ থেকে চামড়া দান করেন, যাতে সেই অর্থ এতিম শিশুদের খাবার, শিক্ষা ও আশ্রয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু যখন বাজারে চামড়ার দাম কমে যায় কিংবা চামড়া নষ্ট হয়ে যায়, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই অসহায় প্রতিষ্ঠানগুলো। অনেক এতিমখানা ঈদের পর প্রত্যাশিত আয় না পাওয়ায় বছরের বাজেট সংকটে পড়ে। ফলে চামড়া রক্ষা করা কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি একটি মানবিক দায়িত্বও।
চামড়া শিল্প বাংলাদেশের জন্য একসময় অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত ছিল। দেশের ট্যানারি শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি তৈরি করেছিল। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা ছিল উল্লেখযোগ্য। জুতা, ব্যাগ, বেল্ট, জ্যাকেটসহ নানা পণ্য বিদেশে রপ্তানি হয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখত। কিন্তু নানা অব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত সংকট এবং কাঁচা চামড়ার মানহানির কারণে সেই সম্ভাবনা অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোরবানির মৌসুমে সংগৃহীত চামড়ার একটি বড় অংশ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে বাংলাদেশ আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে। কারণ আমাদের দেশে পশুর সংখ্যা, শ্রমশক্তি এবং উৎপাদন ব্যয়—সব মিলিয়ে চামড়া শিল্পের জন্য অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। প্রয়োজন শুধু দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আধুনিক সংরক্ষণ পদ্ধতি এবং দুর্নীতিমুক্ত বাজার কাঠামো।
প্রতি বছর দেখা যায়, সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে সেই দাম কার্যকর হয় না। গ্রামাঞ্চলে কিংবা শহরের অলিগলিতে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি করেন। অনেক সময় ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাতে দাম কমিয়ে দেন। আবার কোথাও কোথাও পরিবহন সংকট ও সংরক্ষণের অভাবে মানুষ চামড়া ফেলে দিতেও বাধ্য হন। এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; এটি জাতীয় সম্পদের অপচয়।
কোরবানির চামড়া রক্ষায় গণসচেতনতার বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষকে জানতে হবে—জবাইয়ের পরপরই চামড়া পরিষ্কার করে পর্যাপ্ত লবণ লাগাতে হবে। চামড়া ভাঁজ করে এমনভাবে রাখতে হবে যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে। রক্ত, ময়লা ও পানি জমে থাকলে দ্রুত পচন ধরে। পাশাপাশি দ্রুত সংগ্রহ কেন্দ্র বা আড়তে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও জরুরি।
এখানে স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, মসজিদ কমিটি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ঈদের আগে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে মানুষকে চামড়া সংরক্ষণের নিয়ম শেখানো যেতে পারে। টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মসজিদের মাইকে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা গেলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।চামড়া শিল্প ঘিরে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ। অনেক সময় প্রকৃত সংগ্রাহক বা এতিমখানা ন্যায্যমূল্য পায় না, অথচ একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বিপুল মুনাফা অর্জন করে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। সরকার যদি কঠোর নজরদারি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং স্বচ্ছ নিলাম ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
পরিবেশগত দিক থেকেও চামড়া শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে কাঁচা চামড়া পচে পরিবেশ দূষণ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে ট্যানারি শিল্পে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি থাকলে নদী ও জলাশয় দূষিত হয়। তাই চামড়া শিল্প টেকসই করতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার, পরিবেশসম্মত ট্যানারি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করলে এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্যও চামড়া শিল্প একটি সম্ভাবনার ক্ষেত্র। কাঁচা চামড়া শুধু রপ্তানি না করে যদি দেশে উচ্চমূল্যের চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন বাড়ানো যায়, তাহলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। ইতোমধ্যে দেশের কিছু প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের জুতা ও ব্যাগ তৈরি করে বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে। এই সাফল্য আরও বিস্তৃত করা সম্ভব।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও কোরবানির চামড়ার গুরুত্ব রয়েছে। ইসলাম অপচয়কে নিরুৎসাহিত করেছে। কোরবানির প্রতিটি অংশ যথাযথভাবে ব্যবহার করা একটি দায়িত্ব। চামড়া নষ্ট হওয়া মানে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; এটি একধরনের অবহেলা, যা আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও সামনে আনে।
বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা অত্যন্ত কঠিন। বাংলাদেশ যখন নতুন নতুন রপ্তানি খাত খুঁজছে, তখন চামড়া শিল্পকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য হতে পারে দেশের অর্থনীতির আরেকটি শক্তিশালী ভিত্তি। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী মান নিশ্চিত করা।গ্রামের সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে শহরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—সবাই কোনো না কোনোভাবে কোরবানির চামড়ার সঙ্গে যুক্ত। তাই এটি কেবল একটি শিল্পখাত নয়; এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক চক্রের অংশ। এই চক্র সচল থাকলে বহু মানুষের জীবিকা রক্ষা পায়।আমাদের মনে রাখতে হবে, কোরবানির পশুর চামড়া কোনো আবর্জনা নয়। এটি একটি মূল্যবান সম্পদ, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের অর্থনীতি, দরিদ্র মানুষের অধিকার, শিল্পের ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা। তাই কোরবানির আনন্দের পাশাপাশি চামড়া সংরক্ষণ ও সঠিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, যে জাতি তার সম্পদের মূল্য বোঝে না, সে জাতি কখনো টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। কোরবানির চামড়া রক্ষা করা তাই শুধু মৌসুমি দায়িত্ব নয়; এটি অর্থনৈতিক সচেতনতা, সামাজিক মানবিকতা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুতরাং বাংলাদেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে এখন চামড়াকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়