১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

দাম্পত্য জীবনে সুখী হতে মহানবির আদর্শ অনুসরণ

মাহমুদ আহমদ
পারিবারিক কলহ, সংসারে অশান্তি, পরকীয়া, বিবাহবিচ্ছেদ, তালাক, সন্তানরা মন্দ কাজে জড়িয়ে যাওয়া সহ নানান সমস্যার এক দীর্ঘ লিস্ট আমাদের প্রত্যেকের কাছে রয়েছে। এর মধ্যে একটি বড়ো সমস্যা হলো ঘরের শান্তি এবং পারিবারিক জীবনের আনন্দ হারিয়ে যাওয়া। পিতামাতারাও আজ এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন যে, সন্তানদের প্রতি দৃষ্টি দেওয়ারই যেন সময় নেই। যার ফলে নতুন প্রজন্ম বঞ্চিত হচ্ছে পিতামাতার স্নেহ-মমতা থেকে। এতে করে তৈরি হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক আর ধর্ম ও মায়া-মমতাহীন এক নতুন প্রজন্ম।
এর মূল কারণ হচ্ছে আধুনিকতার নামে আমরা আমাদের সন্তানদের সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েছি। যদিও একজন সন্তানের সুশিক্ষা এবং দেখভালের দায়িত্ব আল্লাহ পিতামাতার ওপর দিয়েছেন। তাই পিতামাতাকে সন্তান লালন পালনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি দায়িত্বশীল হতে হয়।
এ ক্ষেত্রে একজন পিতামাতাকে অবশ্যই উন্নত আদর্শের হতে হবে। মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পিতামাতাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘কোনো পিতা তার পুত্রকে উত্তম শিষ্টাচার অপেক্ষা অধিক শ্রেয় আর কোনো বস্তু দান করতে পারে না’ (তিরমিজি)।
তাই পিতামাতার উচিত হবে সন্তানদের উত্তম ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। আবার পিতামাতার প্রতিও সন্তানেরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে। সে বিষয়েও দৃষ্টি দিতে হবে।বিবাহিত জীবনে আমরা সবাই সুখী হতে চাই কিন্তু কতজন সুখী? বর্তমান সময়ে সুখী পরিবার পাওয়া অনেক কঠিন বিষয়।
সুখী পরিবার তখনই গড়ে উঠে যখন স্বামী-স্ত্রী একে অন্যকে সহযোগিতা করেন ও নিজেদের মধ্যকার বোঝাবুঝি ভালো রাখেন, তবেই বিবাহিত জীবনে সুখী হওয়া সম্ভব।এক্ষেত্রে আমাদের সামনে বিশ্বনবি ও শেষ্ঠনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অতুলনীয় আদর্শ রয়েছে।
সন্তানের উত্তম আদর্শ এবং উত্তম চরিত্রের জন্য স্বামী-স্ত্রী পরস্পর সুন্দর ও উত্তম সংসার জীবন যাপন করাকে আল্লাহতায়ালা আবশ্যক করেছেন। এটিই সেই স্থায়ী রতন যার কল্যাণে বৈবাহিক জীবন এক পবিত্র বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়। এর মূল তাকওয়ার ভূমিতে প্রথিত হয় আর এর শাখাসমূহ আকাশের চূড়াকে স্পর্শ করে। আর এই রতনের কল্যাণে উক্ত বৃক্ষ এক চির বসন্তের বৃক্ষে পরিণত হয়, যা জীবনের প্রত্যেক অবস্থানে সর্বদা তাজা ও সতেজ-সুস্বাদু ফল প্রদান করে।
অথচ বর্তমান প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সুখের সংসার ভেঙে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। আর এটি মানুষকে ব্যভিচারের দিকে টেনে নেয়। যা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যখন ভারসাম্যহীন, পারস্পরিক মনোমালিন্য ও সাংসারিক তিক্ততা দেখা দেয়, তখন একত্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য বিবাহ চুক্তির অবসান ঘটানোর সুযোগ ইসলাম রেখেছে ঠিকই, তবে ইসলামে তালাক প্রদানে উৎসাহিত করা হয়নি।
ইসলামের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্পর্ক পারস্পরিক ভালোবাসা, আনুগত্য, সহযোগিতা ও সমঝোতার। এখানে স্বামীর কর্তৃত্ব বেশি বলে তিনি যেমন : ক্ষমতা প্রদর্শন করবেন না, তদ্রুপ স্ত্রীকেও সর্বদা স্বামীর আনুগত্য প্রদর্শন ও সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে পারিবারিক যে-কোনো কলহ-বিবাদ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। বর্তমানে বিয়ে-বিচ্ছেদের যে-সব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে, তার পেছনে মূল সমস্যা হিসেবে আধুনিকতা, চাহিদা, আনুগত্য, সহযোগিতা ও সমঝোতার ভাব না থাকা।একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রীদের ঘরে বন্দি করে রাখেননি। তাদের নিয়ে সফর করেছেন। যুদ্ধে গিয়েছেন। ঘুরেছেন এবং খেলাধুলায়ও প্রতিযোগিতা করেছেন। কিন্তু মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে এমন কোনো ঘটনা ঘটতে দেননি, যার মাধ্যমে তিনি বৈধ পন্থায় তাঁর স্ত্রীর মধ্যে আনন্দ-বিনোদান কিংবা মজা জাগিয়ে তোলেননি। হাদিসে এসেছে-
হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে কোনো এক ভ্রমণে বের হলাম, সে সময় আমি অল্প বয়সি ও শারীরিক গঠনের দিক দিয়েও পাতলা ছিলাম; তখনো মোটা-তাজা (স্বাস্থ্য ভারি) হইনি। তিনি সাহাবিদের বললেন, ‘তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হও।
তারা যখন সামনের দিকে অগ্রসর হলো, তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘এসো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি; এরপর আমি তাঁর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলাম এবং আমি তার উপর বিজয় লাভ করলাম। তিনি সে দিন আমাকে কিছুই বললেন না।
এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়; প্রিয়নবি ছিলেন দাম্পত্য জীবনে স্ত্রীদের প্রতি চিত্ত বিনোদন দানকারী। তাদের প্রতি গুরুত্বারোপকারী। ভ্রমণে বের হয়ে তিনি সাহাবিদের আগে পাঠিয়ে দিয়ে খেলাধুলার প্রতিযোগিতা করে স্ত্রীদের বিনোদন দিয়েছিলেন। একবার তিনি হেরে গিয়ে স্ত্রীদের আনন্দ দিয়েছিলেন। আবার তিনি বিজয়ী হয়ে নিজে আনন্দ পেয়েছিলেন।
স্ত্রীদের প্রতি এ সবই ছিল মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুখী দাম্পত্য জীবন ও সুন্দর চিত্ত বিনোদন এবং স্ত্রীর ব্যাপারে অসীম গুরুত্বারোপের বহিঃপ্রকাশ। মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুকরণীয় সর্বোত্তম আদর্শ। যার বাস্তবায়নে প্রতিটি পরিবারে বিরাজ করবে জান্নাতি সুখ ও শান্তি।
তাই সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়ের একে অপরের সহযোগিতার প্রয়োজন। কেননা দাম্পত্য সম্পর্কের অশান্তি জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও বড়ো রকম প্রভাব ফেলে। এজন্য প্রত্যেক বিবাহিত দম্পতির উচিত নিজেদের সম্পর্ককে সুস্থ ও সুন্দর রাখার চেষ্টা করা, নিয়মিত নিজেদের সম্পর্কের যত্ন নেওয়া।পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দোয়া করা তিনি যেন সংসারে সুখ-শান্তি বজায় রাখেন, দ্বন্দ্ব-কলহ থেকে হেফাজত করেন। সুখী দাম্পত্যের জন্য আমরা পবিত্র কুরআনের এই দোয়াটি বেশি বেশি পাঠ করতে পারি-রাব্বানা হাব লানা মিন আওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আইয়ুনিন ওয়া-জআলনা লিলমুত্তাকীনা ইমামা। অর্থ: হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন জীবনসঙ্গী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দিন। (সুরা ফুরকান: ৭৪)
আল্লাহপাকের কাছে এই কামনাই করি, আমরা যেন আমাদের প্রিয়নবি ও শ্রেষ্ঠনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পারিবারিক আদর্শ অনুসরণ করে জীবন পরিচালিত করার সৌভাগ্য লাভ করি।
লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়