৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

কারা জিতবে কাপ, ফুটবল ইতিহাস কী বলে?

ড. হাসিনুর রহমান খান
ফুটবলকে বলা হয় ‘অনিশ্চয়তার খেলা’। নব্বই মিনিটে যে কোনো কিছু ঘটতে পারে। দুর্বল দল শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দিতে পারে, অখ্যাত কোনো খেলোয়াড় রাতারাতি হয়ে উঠতে পারেন জাতীয় বীর। বিশ্বকাপের ইতিহাসও এমন অসংখ্য রূপকথা, নাটকীয়তা এবং বিস্ময়ের সাক্ষী। ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইংল্যান্ডের হার, ১৯৫৪ সালের ‘মিরাকল অব বার্ন’, ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিফাইনাল কিংবা ২০২২ সালে মরক্কোর সেমিফাইনালে ওঠা—এসব ঘটনাই ফুটবলকে বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় খেলায় পরিণত করেছে।
তবু একটি প্রশ্ন থেকে যায়—বিশ্বকাপের মতো দীর্ঘ, কঠিন এবং উচ্চ প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টে শেষ পর্যন্ত কারা চ্যাম্পিয়ন হয়? আবেগ, সমর্থন কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দের বাইরে গিয়ে যদি ইতিহাস ও পরিসংখ্যানের কাছে উত্তর খোঁজা হয়, তাহলে বিস্ময়করভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে চলে আসে। বিশ্বকাপের ট্রফি টুর্নামেন্ট শুরুর আগে থাকা শীর্ষ র‍্যাংকধারী কয়েকটি দেশের মধ্যেই ঘুরপাক খায়। অর্থাৎ, বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ও শীর্ষ র‍্যাংকিংয়ের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক বিদ্যমান।
বিশ্বকাপ নিয়ে অসংখ্য আলোচনা, বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাস দেখা গেলেও একটি মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হয়—বিশ্বকাপ শুরুর আগে কোনো দেশের আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিং এবং সেই দেশের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনার মধ্যে আসলে কতটা সম্পর্ক রয়েছে? র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকলেই কি বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি? নাকি ইতিহাস অন্য কিছু বলে? গত বিশ্বকাপগুলোতে চ্যাম্পিয়ন ও রানার-আপ দলগুলোর র‍্যাংকিং বিশ্লেষণ করলে কি কোনো নির্দিষ্ট ধারা, সহ-সম্পর্ক বা সম্ভাবনার বণ্টন খুঁজে পাওয়া যায়?
র‍্যাংকিং যত ভালো হয়, ততই দেশটি শক্তিশালী হবে—এটি প্রত্যাশিত। কিন্তু র‍্যাংকিং কি সত্যিই বিশ্বকাপের ফলাফল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ইঙ্গিত দিতে পারে, নাকি এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অবস্থানমাত্র? আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিশ্বকাপ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও এই প্রশ্নগুলোর পরিসংখ্যানভিত্তিক উত্তর খোঁজার চেষ্টা খুব কমই চোখে পড়ে।
বিশ্বকাপ ২০২৬ সামনে রেখে আমি খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছি—বিশ্বকাপের ইতিহাস এই সম্পর্ক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আসলে কী বলে? র‍্যাংকিংয়ের কোন অবস্থান থেকে সবচেয়ে বেশি চ্যাম্পিয়ন এসেছে, শীর্ষ পাঁচে থাকা দলগুলোর সাফল্যের হার কত, আর র‍্যাংকিং ও বিশ্বকাপ জয়ের মধ্যে বাস্তবে কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে। ফুটবলের আবেগের বাইরে গিয়ে ইতিহাস ও পরিসংখ্যানের আলোকে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি।
বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত FIFA Men’s World Ranking চালু হয় ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে। ফলে তার আগের বিশ্বকাপগুলো বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ফুটবল গবেষকরা সাধারণত World Football Elo Rating System ব্যবহার করেন। আন্তর্জাতিক ম্যাচের ফলাফল, প্রতিপক্ষের শক্তি, ম্যাচের গুরুত্ব এবং জয়-পরাজয়ের ব্যবধান বিবেচনায় নেওয়া এই পদ্ধতিকে অনেক বিশেষজ্ঞ অতীতের দলগুলোর প্রকৃত সামর্থ্য পরিমাপের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন।
১৯৩০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যকার চারটি বিশ্বকাপের জন্য নির্ভরযোগ্য র‍্যাংকিং তথ্য না থাকায় সেগুলো এই বিশ্লেষণের বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে ১৯৫৪ থেকে ২০২২ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ১৮টি বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন ও রানার-আপ দলের টুর্নামেন্টপূর্ব Elo বা FIFA Ranking এই বিশ্লেষণের ভিত্তি।
এই ১৮টি বিশ্বকাপের মধ্যে ১৫টি বা ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়ন এসেছে টুর্নামেন্টপূর্ব শীর্ষ পাঁচ র‍্যাংকধারী দলের মধ্য থেকে। শীর্ষ সাত দলের হিসাব ধরলে সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৮৮ দশমিক ৮৯ শতাংশে, অর্থাৎ ১৮টির মধ্যে ১৬টি বিশ্বকাপ। অন্যভাবে বললে, গত সাত দশকের বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রতি ৯টি বিশ্বকাপের প্রায় ৮টিতেই ট্রফি উঠেছে বিশ্বের শীর্ষ সাত র‍্যাংকিংয়ে থাকা কোনো না কোনো দলের হাতে।
বর্তমান ফিফা র‍্যাংকিং অনুযায়ী শীর্ষ পাঁচটি দেশ হলো আর্জেন্টিনা, স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও পর্তুগাল। ফলে ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী বলা যায়, এই পাঁচ দলের মধ্য থেকেই পরবর্তী বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আসার সম্ভাবনা প্রায় ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
পরিসংখ্যান সম্ভাবনার ভাষায় কথা বলে, নিশ্চয়তার ভাষায় নয়। তবু সাত দশকের বিশ্বকাপ ইতিহাস আমাদের অনেক কিছু শেখায়। বিশ্বকাপের ট্রফি সাধারণত সেই দলগুলোর হাতেই ওঠে, যারা বিশ্বকাপ শুরুর আগেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়ে র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ পাঁচ কিংবা সাত দলের মধ্যে অবস্থান করে। বিশ্বকাপ জয় কোনো একক ম্যাচের ফল নয়; এটি অনেক বছরের পরিকল্পনা, শতাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ, খেলোয়াড় উন্নয়ন কর্মসূচি, কৌশলগত প্রস্তুতি এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের সমন্বিত ফল।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৮টি বিশ্বকাপের মধ্যে ১০টি বা প্রায় ৫৬ শতাংশ শিরোপা জিতেছে দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় স্থানে থাকা দলগুলো। সবচেয়ে সফল অবস্থান হলো র‍্যাংকিং ৩। এই অবস্থান থেকে জয় এসেছে ৬টি বিশ্বকাপে (৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ)। র‍্যাংক ২ দল জিতেছে ৪টি বিশ্বকাপ (২২ দশমিক ২ শতাংশ)। অন্যদিকে র‍্যাংক ১ দল জিতেছে মাত্র ২টি বিশ্বকাপ (১১ দশমিক ১ শতাংশ)।
১১ জুন ফিফার সর্বশেষ প্রকাশিত র‍্যাংকিং অনুযায়ী তৃতীয় স্থানে রয়েছে ফ্রান্স এবং দ্বিতীয় স্থানে স্পেন। অতীতের পরিসংখ্যানগত ধারা অনুসরণ করলে এ দুই দলের সম্ভাবনাই তুলনামূলকভাবে বেশি বলে মনে হয়। অন্যদিকে শীর্ষে থাকা আর্জেন্টিনার সম্ভাবনা ইতিহাসের এই নির্দিষ্ট প্রবণতার আলোকে কিছুটা কম বলে প্রতীয়মান হয়।প্রথম দেখায় এটি বিস্ময়কর মনে হতে পারে। বিশ্বের এক নম্বর দলই তো সবচেয়ে শক্তিশালী হওয়ার কথা। তাহলে তারা বেশি বিশ্বকাপ জিতছে না কেন? এর সুনির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে এর পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রত্যাশার চাপ। এক নম্বর দল হিসেবে বিশ্বকাপে নামা মানেই কোটি সমর্থকের বাড়তি প্রত্যাশা, মিডিয়ার নিবিড় নজরদারি এবং প্রতিপক্ষের বিশেষ প্রস্তুতি। অন্যদিকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থানে থাকা দলগুলো তুলনামূলক কম চাপ নিয়ে টুর্নামেন্টে প্রবেশ করে, অথচ তাদের সামর্থ্য প্রায় একই পর্যায়ের থাকে।
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল শুধু সর্বাধিক শিরোপাই জেতেনি, প্রতিটি বিশ্বকাপেও অংশগ্রহণ করেছে। ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২ সালের শিরোপাগুলো হঠাৎ করে পাওয়া কোনো ঘটনা ছিল না; বরং ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ, প্রতিভা বিকাশ এবং সমৃদ্ধ ফুটবল সংস্কৃতির ফল। ব্রাজিলের সে সময়কার র‍্যাংকিং ছিল যথাক্রমে ২, ২, ১, ৩ ও ৩।
খেয়াল করার বিষয় হলো, ব্রাজিলের পাঁচটি শিরোপার চারটিই এসেছে দ্বিতীয় বা তৃতীয় র‍্যাংকিং থেকে। তিনের বেশি র‍্যাংকিং নিয়ে তারা কখনো বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। আরেকটি মজার তথ্য হলো, ছয় নম্বর র‍্যাংকিং নিয়ে কোনো দলই এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। সর্বশেষ ফিফা র‍্যাংকিং অনুযায়ী ব্রাজিলের বর্তমান অবস্থান ৬। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—ইতিহাসের এই ধারা কি ব্রাজিলের জন্য অশনি-সংকেত?
জার্মানি চারবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে—১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ ও ২০১৪ সালে। সে সময় তাদের র‍্যাংকিং ছিল যথাক্রমে ৩, ১, ৩ ও ২। তাদের সাফল্যের মূল ভিত্তি ছিল শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা, যুব উন্নয়ন ব্যবস্থা এবং বড় টুর্নামেন্টে নিজেদের সেরা রূপ দেখানোর অসাধারণ সক্ষমতা। জার্মানির ক্ষেত্রেও দেখা যায়, তিনের বেশি র‍্যাংকিং নিয়ে তারা কখনো বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। বর্তমানে তাদের অবস্থান ১০ নম্বরে। ইতিহাসের পরিসংখ্যানকে গুরুত্ব দিলে জার্মানির সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম বলেই মনে হয়।
আর্জেন্টিনা ১৯৭৮, ১৯৮৬ এবং ২০২২ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে যথাক্রমে ৪, ৫ ও ৩ নম্বর র‍্যাংকিং নিয়ে। ম্যারাডোনা থেকে মেসি—দুই প্রজন্মের অসাধারণ প্রতিভা আর্জেন্টিনাকে ইতিহাসের অন্যতম সফল দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এক বা দুই নম্বর র‍্যাংকিং নিয়ে আর্জেন্টিনা কখনো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়নি। বর্তমানে তারা ফিফা র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষে রয়েছে। ফলে প্রশ্ন জাগে, অতীতের ধারা কি এবারও বহাল থাকবে? পরিসংখ্যানগত প্রবণতা বলছে, কাজটি তাদের জন্য সহজ হবে না।
ফ্রান্স ১৯৯৮ ও ২০১৮ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সময় যথাক্রমে ৭ এবং ১৮ নম্বর র‍্যাংকিংয়ে ছিল। বর্তমানে তারা রয়েছে ৩ নম্বরে। অতীতে অপেক্ষাকৃত নিচের অবস্থান থেকেও তারা শিরোপা জিতেছে। ফলে বর্তমান অবস্থান এবং দলের সামর্থ্য বিবেচনায় ফ্রান্সকে অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে দেখাই স্বাভাবিক।
১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে ইতালি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সময় নির্ভরযোগ্য র‍্যাংকিং তথ্য নেই। তবে ১৯৮২ ও ২০০৬ সালে তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় যথাক্রমে ৩ ও ১৩ নম্বর র‍্যাংকিং নিয়ে। অথচ এবারের বিশ্বকাপে ইতালি অংশগ্রহণের যোগ্যতাই অর্জন করতে পারেনি।১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড এবং ২০১০ সালে স্পেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সময় উভয়েরই র‍্যাংকিং ছিল ২। বর্তমানে ইংল্যান্ড রয়েছে চতুর্থ স্থানে। অতীতের ধারা বিবেচনায় তাদের সম্ভাবনাও যথেষ্ট উজ্জ্বল।
অন্যদিকে স্পেনের একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা আসে ২০১০ সালে, যখন তাদের র‍্যাংকিং ছিল ২। সর্বশেষ ফিফা র‍্যাংকিংয়েও স্পেনের অবস্থান ২ নম্বরে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—ইতিহাস কি নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে? তবে শুধু র‍্যাংকিং নয়, স্পেনের বর্তমান স্কোয়াডও তাদের এগিয়ে রাখছে। রক্ষণ, মধ্য মাঠ ও আক্রমণভাগ—সব ক্ষেত্রেই রয়েছে প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড়দের সমন্বয়। সে কারণেই অনেক বিশ্লেষকের কাছে স্পেন এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার।
শুধু চ্যাম্পিয়ন নয়, রানার-আপদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ফলাফল দেখা যায়। ১৮টি বিশ্বকাপের মধ্যে ১৪টি বা প্রায় ৭৮ শতাংশ ক্ষেত্রে রানার-আপ দলও ছিল শীর্ষ পাঁচ র‍্যাংকধারী দলের মধ্যে। সবচেয়ে বেশি রানার-আপ এসেছে চতুর্থ অবস্থান থেকে। মোট ছয়বার (৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ) চতুর্থ স্থানে থাকা দল ফাইনালে উঠেও শিরোপা জিততে পারেনি। এছাড়া দ্বিতীয় ও পঞ্চম অবস্থান থেকে তিনবার করে রানার-আপ এসেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এক নম্বর র‍্যাংকিং থেকে মাত্র একবার রানার-আপ এসেছে, আর তিন নম্বর র‍্যাংকিং থেকে একবারও নয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ফাইনালে পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও শীর্ষ পাঁচ র‍্যাংকিং একটি শক্তিশালী সূচক। অর্থাৎ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন এবং রানার-আপ—উভয় দলই ছিল শীর্ষ পাঁচ র‍্যাংকধারী।
ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই যে এটি কখনোই পুরোপুরি কোনো প্যাটার্ন বা পরিসংখ্যানের নিয়ম মেনে চলে না। ১৯৯৮ সালে স্বাগতিক ফ্রান্স বিশ্বকাপ শুরু করেছিল ১৮ নম্বর র‍্যাংকিং থেকে। ২০০৬ সালে ইতালি ছিল ১৩ নম্বরে। ২০১৮ সালে ফ্রান্স ছিল সপ্তম স্থানে। তবুও তারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আবার ১৯৫৪ সালের হাঙ্গেরিকে অনেক বিশেষজ্ঞ সর্বকালের অন্যতম সেরা দল মনে করেন। তারা পুরো টুর্নামেন্টে আধিপত্য বিস্তার করেও ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে পরাজিত হয়েছিল। ইতিহাস এই ঘটনাকে আজও ‘মিরাকল অব বার্ন’ নামে স্মরণ করে।একইভাবে ১৯৮২ সালের ব্রাজিল দলকে অনেকেই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল বলে মনে করেন। জিকো, সক্রেটিস, ফ্যালকাওদের সেই দল দৃষ্টিনন্দন ফুটবল উপহার দিয়েও বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। এসব উদাহরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—র‍্যাংকিং কেবল সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়, ফলাফলের নিশ্চয়তা নয়।
২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে রেখে এই ইতিহাস নতুন তাৎপর্য বহন করছে। বর্তমান র‍্যাংকিংয়ে শীর্ষে থাকা আর্জেন্টিনা, স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ব্রাজিল ও পর্তুগালের মতো দলগুলো স্বাভাবিকভাবেই শিরোপা দৌড়ে এগিয়ে থাকবে। ইতিহাস বলছে, সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন খুঁজতে হলে প্রথমেই নজর দিতে হবে এই শীর্ষ সারির দলগুলোর দিকে। কারণ গত ১৮টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রায় ৮৩ শতাংশ চ্যাম্পিয়ন এসেছে শীর্ষ পাঁচ থেকে এবং প্রায় ৮৯ শতাংশ এসেছে শীর্ষ সাত থেকে। তবে এর অর্থ এই নয় যে অন্য কেউ চমক দেখাতে পারবে না। ২০২২ সালে খুব কম মানুষই মরক্কোর সেমিফাইনালে ওঠার কথা ভেবেছিল। ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়ার ফাইনালে ওঠাও ছিল অনেকের কল্পনার বাইরে। ২০১৪ সালে কোস্টারিকার কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা ছিল আরেকটি বড় বিস্ময়। ফুটবল বারবার প্রমাণ করেছে—অসম্ভব বলে কিছু নেই।
পরিসংখ্যান সম্ভাবনার ভাষায় কথা বলে, নিশ্চয়তার ভাষায় নয়। তবু সাত দশকের বিশ্বকাপ ইতিহাস আমাদের অনেক কিছু শেখায়। বিশ্বকাপের ট্রফি সাধারণত সেই দলগুলোর হাতেই ওঠে, যারা বিশ্বকাপ শুরুর আগেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়ে র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ পাঁচ কিংবা সাত দলের মধ্যে অবস্থান করে। বিশ্বকাপ জয় কোনো একক ম্যাচের ফল নয়; এটি অনেক বছরের পরিকল্পনা, শতাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ, খেলোয়াড় উন্নয়ন কর্মসূচি, কৌশলগত প্রস্তুতি এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের সমন্বিত ফল।তাই বিশ্বকাপ ২০২৬ সামনে রেখে যদি কেউ জানতে চান সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন কারা, তাহলে ইতিহাসের উত্তর হবে—প্রথমে তাকান র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ সারির দিকে। কারণ ফুটবলে বিস্ময় ঘটতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ সময়ই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে ওঠে সেই দল, যারা টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষর রেখে এসেছে।
লেখক : অধ্যাপক, ফলিত পরিসংখ্যান এবং ডেটা সায়েন্স, পরিসংখ্যান গবেষণা ও শিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়