দীর্ঘ সময় ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি না কমে বরং আরো বাড়ছে। মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।একই সঙ্গে কমছে ক্রয়ক্ষমতা বা ভোক্তার চাহিদা। এর প্রভাব পড়ছে শিল্পোৎপাদনে। একই সঙ্গে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটেও কমছে উৎপাদন। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অনেক কলকারখানাই লাভজনকভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দেশের অর্থনীতি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলেই মনে করেন ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদরা। গত শনিবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক (ইপিআই) ঢাকার সামষ্টিক অর্থনীতির ত্রৈমাসিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট ও তা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে কথা বলেন। ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি কঠিন সময় পার করছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’ তিনি বলেন, প্রচলিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক অনেক সময় তাৎক্ষণিক বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়। এ কারণেই ডিসিসিআই ‘অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক (ইপিআই)’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে নীতিনির্ধারক ও উদ্যোক্তারা বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই মহাসচিব (ভারপ্রাপ্ত) ড. এ কে এম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী। তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্যের ভিত্তিতে এই গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষি উৎপাদন কমে যাচ্ছে, যা খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। একই সঙ্গে জ্বালানিসংকটের কারণে শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় কৃষিপণ্যের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনায় সরকারি অনুমোদনপ্রক্রিয়ার জটিলতা কমানো, মূল্য সংযোজন করের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং বন্দরগুলোতে পণ্য খালাস প্রক্রিয়া দ্রুত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, বর্তমানে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রবণতা এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা। তিনি জানান, ব্যবসা সহজীকরণে সরকার আমদানিনীতি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নতুন নীতিমালা চূড়ান্ত হতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন বলেন, শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে, যেখানে শক্তিশালী পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু পুঁজিবাজার এখনো কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধসহ নানা কারণে বিশ্বব্যাপী এক ধরনের অস্থিরতা রয়েছে। এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অনেক প্রতিকূলতাও অর্থনীতির গতিশীলতাকে শ্লথ করে দিচ্ছে। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে শিল্প-কারখানাগুলো ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারছে না। মূলধন সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আমরা মনে করি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যাংকঋণের সুদহার কমিয়ে এনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে হবে। গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

