৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ২০শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

গিজনের কলঙ্ক : যে ‘ম্যাচ ফিক্সিং’ চিরতরে বদলে দিয়েছে বিশ্বকাপের নিয়ম

প্রতিদিনের ডেস্ক:
১৯৮২ সালের ২৫ জুন। স্পেনের উত্তরাঞ্চলীয় শহর গিজনের এল মোলিনন স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ম্যাচ চলছিল। মাঠে ছিল পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া। কাগজে-কলমে এটি ছিল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের একটি সাধারণ ম্যাচ। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি পরিণত হয় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়গুলোর একটিতে। আজও সেই ম্যাচকে বলা হয়—‘দ্য ডিসগ্রেস অব গিজন’ বা ‘গিজনের কলঙ্ক’।
ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন স্কটিশ রেফারি বব ভ্যালেন্টাইন। জীবনের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ পরিচালনা করতে নেমে তিনি বুঝতেই পারেননি, কয়েক মিনিট পর এমন এক নাটকের সাক্ষী হতে যাচ্ছেন যা বদলে দেবে বিশ্বকাপের নিয়মই।
ভ্যালেন্টাইন পরবর্তীতে বলছিলেন, ‘ওই ম্যাচ ফুটবলকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। বিশ্বকাপ আয়োজকেরা এতটাই বিব্রত হয়েছিল যে পরে নিয়মই বদলে ফেলতে বাধ্য হয়।
যাতে আর কখনো এমন কিছু না ঘটে।’
সেই সময় বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো একসঙ্গে হতো না। পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া মাঠে নামার আগেই জেনে গিয়েছিল সব হিসাব। তারা জানত, জার্মানি যদি ১-০ গোলে জেতে, তাহলে দুই দলই পরের রাউন্ডে চলে যাবে। বিদায় নিতে হবে আলজেরিয়াকে। খেলা শুরুর মাত্র ১১ মিনিটে গোল করেন জার্মানির হর্স্ট হ্রুবেশ। তখনো দর্শকেরা বুঝতে পারেননি সামনে কী অপেক্ষা করছে। কিন্তু গোলের পরই ম্যাচ যেন থেমে গেল।পাস হচ্ছে, বল ঘুরছে, কিন্তু কেউ আক্রমণে যাচ্ছে না। কেউ ট্যাকল করছে না। কেউ দৌড়াচ্ছে না। যেন দুই দল মাঠে নেমেছে সময় কাটাতে।ভ্যালেন্টাইন বলেন, ‘২০ মিনিটের মাথায় আমার মনে সন্দেহ জাগে। আমি ভাবছিলাম, এখানে তো কেউ ট্যাকলই করছে না! এরপর একজন খেলোয়াড় মাঝমাঠ পার হয়ে বল আবার নিজের গোলরক্ষকের কাছে ফিরিয়ে দিল। তখনই বুঝলাম কিছু একটা অস্বাভাবিক।’
ম্যাচের বাকি সময়টা হয়ে ওঠে প্রহসন। বল এক দলের কাছে কিছুক্ষণ, তারপর আরেক দলের কাছে। কিন্তু গোলমুখে যাওয়ার কোনো চেষ্টা নেই। পুরো ম্যাচে রেফারির অবস্থান প্রায় মাঝমাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল।পরবর্তীতে এই ম্যাচের নাম দেওয়া হয় ‘নিশটআংগ্রিফস্পাক্ট ফন গিজন’—অর্থাৎ ‘গিজনের অনাক্রমণ চুক্তি’। অনেকে সরাসরি একে ম্যাচ ফিক্সিংও বলেছেন।স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৪১ হাজার দর্শক দ্রুতই বুঝে ফেলেছিল কী হচ্ছে। গ্যালারি থেকে শুরু হয় তীব্র বাঁশি, বিদ্রূপ আর প্রতিবাদ। স্প্যানিশ দর্শকেরা চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘ফুয়েরা, ফুয়েরা’—মানে ‘বের হয়ে যাও!’কেউ সাদা রুমাল নাড়িয়ে প্রতিবাদ জানায়। এক জার্মান সমর্থক নিজের দেশের পতাকাই আগুনে পুড়িয়ে দেন।
জার্মান টেলিভিশনের ধারাভাষ্যকার এবেরহার্ড স্টানজেকের কণ্ঠ কেঁপে উঠেছিল ক্ষোভে। এক অস্ট্রিয়ান ধারাভাষ্যকার তো শেষ ৩০ মিনিট কথা বলাই বন্ধ করে দেন। দর্শকদের টেলিভিশন বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের আইটিভির ধারাভাষ্যকার হিউ জনস বলেছিলেন, ‘এটি আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে লজ্জাজনক ম্যাচগুলোর একটি।’আলজেরিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি বেনালি সেককাল ফিফার কাছে অভিযোগও করেছিলেন। তার ভাষায়, এটি ছিল ‘কেলেঙ্কারিপূর্ণ ও অনৈতিক’ ম্যাচ। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছিল রেফারি বব ভ্যালেন্টাইনকে নিয়েও। কেন তিনি খেলোয়াড়দের সতর্ক করলেন না? কেন কাউকে কার্ড দেখালেন না? তবে চার দশক পরও নিজের অবস্থান থেকে সরেননি ভ্যালেন্টাইন। তিনি বলেন, ‘রেফারির কাজ নিয়ম প্রয়োগ করা। আমি কি খেলোয়াড়দের বলব—তোমরা আরো জোরে দৌড়াও, আরো আক্রমণ করো? সেটা তো সম্ভব নয়। বক্সিং ম্যাচে গিয়ে যেমন বলা যায় না—আরো জোরে ঘুষি মারো!’ সেই রাতে তার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল অন্য কিছু। স্টেডিয়ামে প্রায় ৮ হাজার আলজেরিয়ান সমর্থক ছিল। তারা ভেবেছিল নিজেদের দল দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠবে। কিন্তু মাঠের নাটক দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তারা। অনেকে গ্যালারির ফাঁক দিয়ে টাকার নোট দেখাচ্ছিল, কেউ মাঠে ঢোকার চেষ্টাও করছিল।ভ্যালেন্টাইন বলেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছিলাম, যদি তারা মাঠে ঢুকে পড়ে তাহলে ম্যাচই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আমার কাছে মনে হয়েছিল, খারাপভাবে হলেও ম্যাচ শেষ হওয়া, ম্যাচ বন্ধ হয়ে যাওয়ার চেয়ে ভালো।’
আলজেরিয়ার জন্য ঘটনাটি ছিল নির্মম। তারা ওই বিশ্বকাপে দুটি ম্যাচ জিতেছিল, যার মধ্যে ছিল পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ২-১ গোলের ঐতিহাসিক জয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ আর সুবিধাবাদী ফুটবলের কাছে হার মানতে হয় তাদের। পশ্চিম জার্মানির সাবেক খেলোয়াড় ভিলি শুলৎস নিজের দেশের দলকেই বলেছিলেন ‘গ্যাংস্টার’। স্পেনের স্থানীয় পত্রিকা এল কমের্সিও ম্যাচ রিপোর্ট ছাপিয়েছিল খেলার পাতায় নয়, অপরাধ পাতায়। জার্মান ট্যাবলয়েড বিল্ডের শিরোনাম ছিল—‘লজ্জা তোমাদের!’
কিন্তু অভিযুক্তরা অনুতপ্ত ছিলেন না। ম্যাচ শেষে জার্মান দলের হোটেলের বাইরে ক্ষুব্ধ সমর্থকেরা ডিম ছুড়লে খেলোয়াড়েরা নাকি বারান্দা থেকে পানিভর্তি বেলুন ছুড়ে জবাব দিয়েছিল। জার্মান গোলরক্ষক হ্যারাল্ড শুমাখার পরে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, ‘আমার দিকে তো মাত্র দুটি বল এসেছিল—একটা ব্যাকপাস, আরেকটা থ্রো-ইন। আমি কী করতাম? সামনে গিয়ে নিজেই আক্রমণ করতাম?’ অস্ট্রিয়ার প্রতিনিধি হান্স চাকও মন্তব্য করেছিলেন বিতর্কিত ভাষায়। তার বক্তব্য আরও ক্ষোভ বাড়িয়েছিল।এই ঘটনার পরই ফিফা বিশ্বকাপের নিয়ম বদলে দেয়। এরপর থেকে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো একই সময়ে আয়োজন বাধ্যতামূলক করা হয়। বয়স এখন আশির ঘরে। ডান্ডিতে অবসর জীবন কাটান বব ভ্যালেন্টাইন। মাঝে মাঝে স্থানীয় প্রতিযোগিতায় বোলস খেলেন। কিন্তু গিজনের সেই রাত তাকে আজও ছাড়েনি। তিনি বলেন, ‘এখনো মানুষ এসে আমাকে ওই ম্যাচের কথা জিজ্ঞেস করে। আমি শুধু বলি—হ্যাঁ, এটা লজ্জাজনক ছিল। কিন্তু নিয়মের মধ্যে থেকেই সব হয়েছিল। ফুটবলের জন্য সেটা ছিল ভয়ংকর এক দিন।’

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়