২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

বন্যায় ধানের ক্ষতি সামান্য, চাল আমদানির প্রস্তুতি না থাকলে পরিণতি ভয়াবহ

প্রতিদিনের ডেস্ক:
২০১৭ সালের হাওর বন্যায় ধানের যে ক্ষতি হয়েছিল, তা দেশের মোট উৎপাদনের তুলনায় ছিল একেবারেই সামান্য। কিন্তু সেই ঘাটতি পূরণে সময়মতো চাল আমদানির বার্তা দিতে না পারায় বাজারে হু হু করে দাম বেড়ে যায়; যা পরে আর সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।চলতি বছরের এপ্রিলেও হাওরে অকাল বন্যায় প্রায় একই পরিমাণ ধানের ক্ষতি হয়েছে। তবে অতীতের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে এবার বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে আগেভাগেই খাদ্য সরবরাহ বৃদ্ধি ও নজরদারি জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর ৭ জেলার হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যায় নষ্ট হওয়া ধানের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার টন। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা বেশি দাবি করা হলেও, তা দেশের মোট উৎপাদনের ১ থেকে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ মাত্র।আগের (২০২৪-২৫) অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৫ কোটি ৪ লাখ ২৬ হাজার টন দানাদার শস্য উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে চালই ছিল ৪ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার টন (১ কেজি ধানে ৬৮০ গ্রাম চাল—এই হিসাবে সে বছর মোট ধানের উৎপাদন ছিল প্রায় ৬ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার টন)। এই বিপুল উৎপাদনের বিপরীতে এবারের এপ্রিল শেষে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হওয়া ক্ষতি নিতান্তই নগণ্য।
মোট খাদ্য নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে এই ক্ষতি তেমন বড় কোনো প্রভাব ফেলার কথা নয়। কিন্তু বাজারের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে সুযোগসন্ধানী অসাধু ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে পারেন। হাওরে বন্যার অজুহাত তুলে তারা মজুতদারি বাড়াতে পারেন, যা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চালের দাম বাড়িয়ে তুলবে।ঠিক এমন দৃশ্যপটই দেখা গিয়েছিল ২০১৭ সালের মার্চ-এপ্রিলে। সে বছর আগাম পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় হাওরের ৬ জেলায় প্রায় ৩ লাখ হেক্টর জমির বোরো ধান মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তৎকালীন হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় প্রায় ৩ লাখ টন ধান (যা প্রায় ২ লাখ টন চালের সমপরিমাণ) নষ্ট হয়েছিল। অথচ এর আগের ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে মোট চাল উৎপাদন হয়েছিল ৩ কোটি ৪৮ লাখ টন। অর্থাৎ, ২০১৭ সালের বন্যায়ও চালের ক্ষতি মোট উৎপাদনের ১ থেকে ২ শতাংশের নিচেই ছিল।ক্ষতির পরিমাণ সামান্য হলেও ওই সময় চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে এবং তা কার্যকর করতে সরকারের অনেক দেরি হয়ে যায়। ফলে বন্যার পরপরই চালের দাম বাড়তে শুরু করে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বন্যার আগে ২০১৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী মোটা চালের (স্বর্ণা/চায়না ইরি) কেজি ছিল ৩৮-৪০ টাকা; মাঝারি মানের চাল (লতা/পাইজাম) ৪৪-৪৮ টাকা এবং সরু চাল (মিনিকেট/নাজিরশাইল) ৫৮-৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু বন্যার কারণে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে এপ্রিলের শেষে মোটা চাল ৪৪-৪৮ টাকা, মাঝারি চাল ৫০-৫৫ টাকা এবং সরু চাল ৬০-৬৬ টাকায় উঠে যায়।২০১৭ সালের মার্চ-এপ্রিলে চালের দাম বৃদ্ধির আভাস পেয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। পরে জুনের শেষে গিয়ে বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করেও বাজার আর নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বন্যার আগের ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যথাক্রমে ১১৮ ও ৭৬ মিলিয়ন ডলারের চাল আমদানি করা হয়েছিল। অথচ বন্যার অব্যবহিত পর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চাল আমদানির পেছনে ১ হাজার ৭৪৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেও বাজারের ঊর্ধ্বগতি ঠেকানো যায়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এর পরের অর্থবছরে আমদানি আবারও কমে ১২৪ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতের এই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার শুরু থেকেই বাজার মনিটরিং ও সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।হাওরের বন্যায় ফসলের ক্ষতিকে কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে চালের দাম বাড়াচ্ছেন। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে চাল আমদানির পাশাপাশি সঠিক ব্যবস্থাপনা, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং বাজার পর্যবেক্ষণের ওপর জোর দিয়েছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন।তিনি বলেন, ‘এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী আছেন যারা সবসময় দাম বাড়ানোর জন্য একটা অজুহাত খোঁজেন। সামান্য সুযোগ পেলেই তারা দাম বাড়িয়ে দেন, যা ভোক্তাদের জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সরকার নির্দিষ্ট এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেষ্টা করলেও, সারা দেশের মানুষ যে একটি বড় সংকটে পড়তে যাচ্ছে, সে বিষয়ে সরকারের তৎপরতা এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে যত দেরি হবে, সংকট তত ঘনীভূত হবে।’
ঘাটতি পূরণে বাড়তি সতর্কতা হিসাবে খাদ্য আমদানি জরুরি
হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ক্ষতি দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় চাপ তৈরি করতে পারে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এবার সরকারকে বেশি খাদ্য আমদানির জন্য প্রস্তুত থাকতে হতে পারে বলে মন্তব্য করেছন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহদত হোসেন। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের যে ক্ষতিটা হয়েছে, সেটা প্রধানত হাওর অঞ্চলে। এখানকার জেলাগুলোতে ধানের ক্ষতির পরিমাণ কম নয়। কোথাও ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা, কোথাও ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার ক্ষতির আনুমানিক হিসাব পাওয়া যাচ্ছে। তবে এখনো পূর্ণাঙ্গ শুমারি না হওয়ায় সঠিক পরিমাণ বলা কঠিন।’তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলা হলেও বাস্তবে প্রায় প্রতি বছরই কিছু খাদ্য আমদানি করতে হয়। শুধু উৎপাদন করলেই হয় না, খাদ্য নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত মজুতও থাকতে হয়। স্বাধীনতার পর ৫৪ বছরের মধ্যে ৫৩ বছরই বাংলাদেশ খাদ্য আমদানি করেছে।’অধ্যাপক শাহদত বলেন, ‘হাওরাঞ্চল দেশের বোরো ধানের অন্যতম বড় সরবরাহকারী। ফলে এই অঞ্চলের ক্ষতি সামগ্রিক উৎপাদনের ছোট অংশ মনে হলেও মেট্রিক টনের হিসাবে তা অনেক বড়।এতে খাদ্য আমদানির ওপর চাপ বাড়বে।’তিনি আরও বলেন, ‘সরকার ওএমএস কার্যক্রম চালু রাখায় তাদের নিজস্ব খাদ্য মজুতের প্রয়োজনও বেশি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকারকে বাড়তি খাদ্য সংগ্রহ করতে হতে পারে।’সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ঝুঁকির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘পরপর দুটি মৌসুমে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংকট আরও প্রকট হবে। সামনে আমন বা আউশ ধানেরও ক্ষতি হলে পরিস্থিতি আমরা যা ভাবছি তার চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।’বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সংকটের সুযোগ নিয়ে সিন্ডিকেট আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে। তাই সরকারকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। হিসাবের বাইরে চলে গেলে খাদ্য সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’নাজের হোসাইন উল্লেখ করেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধান নষ্ট হওয়ার অর্থই হলো উৎপাদন কমে যাওয়া। এই ঘাটতি মেটাতে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় পর্যায়ে দ্রুত চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সময়মতো আমদানি করা না হলে বাজারে চালের সরবরাহ কমে যাবে এবং দাম আরও বাড়বে। দেশের ১৮ কোটি ভোক্তাকে খাদ্য সংকট ও ‘মূল্য সন্ত্রাস’ থেকে রক্ষা করতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
হাওর অঞ্চলে কৃষকের ক্ষতি, সরকারের সহায়তা ও প্রকৃত চিত্র
হাওরাঞ্চলে ফসলহানির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের ওপর। তবে জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করেন, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনুস। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, “হাওর অঞ্চলের একজন কৃষকের ২০ মণ ধান নষ্ট হলে সরকার হয়তো দুই-তিন হাজার টাকা করে তিন মাস সহায়তা দেবে। কিন্তু ওই ধানের বাজারমূল্য ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। ফলে এই সহায়তা দিয়ে কৃষকের প্রকৃত ক্ষতি পূরণ সম্ভব নয়।’তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অনেকের ঘরে রান্নার চালও থাকবে না। কেউ ধান বিক্রি করে সন্তানের স্কুলের বেতন দিতেন, কেউ মেয়ের বিয়ের খরচ চালাতেন। ফলে এ ক্ষতির বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে হাওর এলাকার কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর ওপর।’ড. ইউনুস বলেন, ‘সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি সঠিক পদক্ষেপ। তবে আগাম সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে দ্রুত ধান কেটে ফেলার ব্যবস্থা করা গেলে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব হতো।’জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে মোট খাদ্যশস্য উৎপাদনের তুলনায় এই ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশি নয়। মোট উৎপাদনের বিপরীতে মাত্র দুই লাখ টন ক্ষতি। এছাড়া সামনে আমনসহ অন্যান্য ফসলও রয়েছে। এ কারণে সারাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা কম।’
তিনি আরও বলেন, ‘খাদ্যবাজারে যদি কোনো সংকট তৈরি হয়, তাহলে সেটি মূলত ব্যবসায়ীদের কারসাজি বা সিন্ডিকেটের কারণে হতে পারে। ২০১৭ সালেও ক্ষতির তুলনায় বাজারে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আমদানিতে বিলম্বের কারণে।’
বাজার মনিটারিংয়ের তাগিদ
বাজার মনিটরিং বা নজরদারির প্রচলিত ধারণা পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করে ক্যাব নেতা তিনি বলেন, ‘মনিটরিং মানে শুধু খুচরা বাজারে গিয়ে দুই-তিনজন দোকানদারকে জরিমানা করা নয়। প্রকৃত মনিটরিংয়ের অংশ হিসেবে দেশে কী পরিমাণ মজুত আছে, তার সঠিক হিসাব রাখতে হবে। এছাড়া আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্রে (এলসি) মূল্য কত ছিল, অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ কত এবং স্থানীয় উৎপাদনের খরচ কত—এই সামগ্রিক হিসাব পর্যালোচনা করে পণ্যের যৌক্তিক দাম নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।’বড় আমদানিকারক ও মজুতদারদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বড় ব্যবসায়ীরা অনেক সময় পণ্য আমদানি করে তা সাথে সাথে বাজারে না ছেড়ে মজুত করে রাখেন। যেমন—চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ আসার পর যদি পণ্য খালাস করতে বা বাজারে ছাড়তে এক সপ্তাহ দেরি করা হয়, তাতেই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে যায়। তাই শুধু খুচরা দোকানে নয়, বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ও গুদামগুলোতেও নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।’পরিশেষে নাজের হোসাইন সতর্ক করে বলেন, সরকারের নির্লিপ্ততা বা সিদ্ধান্তহীনতা অনেক সময় ব্যবসায়ীদের অনৈতিক মুনাফা লোটার সুযোগ করে দেয়। পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত নিশ্চিত না করলে এবং নজরদারি জোরদার না করা হলে ব্যবসায়ীরা বাজার পরিস্থিতি পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়