প্রতিদিনের ডেস্ক:
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ঘটে চলেছে নজিরবিহীন নাটকীয়তা। তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে তৈরি হওয়া ‘বিদ্রোহী’ শিবিরের চাপে শেষ পর্যন্ত দলের সবস্তরের কমিটি ভেঙে দিতে বাধ্য হলেন দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জী। অন্যদিকে, দলীয় নির্দেশ অমান্য করে ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে বিধানসভার বিরোধী দলনেতার পদে বসেছেন তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।
স্পিকারের বড় সিদ্ধান্ত
ঘটনার সূত্রপাত গত বুধবার (৩ জুন)। তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ৫৮ জন বিধায়কের সই করা একটি সমর্থনপত্র নিয়ে রাজ্য বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে দেখা করেন এবং বিরোধী দলনেতার পদের জন্য দাবি জানান। সেই চিঠির ভিত্তিতে স্পিকার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কেই বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন।তবে এর আগেই বিদ্রোহের আঁচ পেয়ে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোলে’ নেমেছিলেন মমতার ভাইপো ও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জী। তিনি স্পিকারের কাছে চিঠি পাঠিয়ে বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু আইনি ও কৌশলগত কারণে স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু অভিষেকের সেই চিঠি গ্রহণ করেননি।
‘মমতা পরামর্শদাতা থাকুন, অভিষেকের কোনো সম্পর্ক নেই’
বিরোধী দলনেতার চেয়ারে বসার পর থেকেই রাজনৈতিকভাবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দর’ ও দাপট দুটোই বাড়তে শুরু করেছে। তার দাবি, তৃণমূলের আরও অনেক বিধায়ক এবং সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে পরাজিত একাধিক হেভিওয়েট নেতা এরই মধ্যে তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।বৃহস্পতিবার বিধানসভার প্রেস কর্নারে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমরা মাননীয়া মমতা ব্যানার্জীকে অসম্মান করছি না। তিনি আমাদের প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে থাকুন, এটাই আমাদের অনুরোধ। তার পরামর্শ পেলে আমরা বিধানসভায় গঠনমূলকভাবে বিরোধী দলের ভূমিকা খুব ভালোভাবে পালন করতে পারব।’তবে অভিষেক ব্যানার্জীকে তীব্র আক্রমণ করে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ‘অষ্টাদশ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সঙ্গে অভিষেক ব্যানার্জীর কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীকে ৮০ জন বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছি। তার মধ্যে ৬০ জনই মনে করছেন সব রীতিনীতি মেনে এই অষ্টাদশ বিধানসভার ভেতরে স্বাধীনভাবে থাকা উচিত। আমরাই আসল তৃণমূল কংগ্রেসকে রিপ্রেজেন্ট করছি।’
কংগ্রেস বা অন্য কোনো দলকে ওয়াকআউটের মাধ্যমে সুবিধা না দিয়ে বিলের মেরিট অনুযায়ী বিধানসভায় ভোট দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন এই বিদ্রোহী নেতা।
পাল্টা চাল মমতার
তৃণমূলের অন্দরে যখন বিদ্রোহের দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে এবং দল ভাঙনের মুখে, ঠিক তখনই কঠোর সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিলেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার নির্দেশে দলের পক্ষ থেকে একটি জরুরি ও আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে।তাতে বলা হয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেসের সবস্তরের কমিটি ভেঙে দেওয়া হলো। দলের সব শাখা সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের পদও বিলুপ্ত করা হয়েছে। এখন থেকে প্রতিটি স্তরে নেতাদের আত্মসমীক্ষা, কর্মদক্ষতা ও সাংগঠনিক মূল্যায়ন করা হবে।দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে, সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে এবং নতুন উদ্যমে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যই এই আমূল পরিবর্তন। তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, নতুন কমিটি গঠনের আড়ালে আসলে বিদ্রোহী বিধায়ক ও নেতাদের ছাঁটাই করতেই মমতার এই চরম পদক্ষেপ।পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে শাসক দলের অন্দরে এমন অভূতপূর্ব ও প্রকাশ্য বিদ্রোহ এর আগে দেখা যায়নি। ঋতব্রতের এই ‘বিদ্রোহ’ এবং মমতার ‘কমিটি ভাঙার’ পাল্টা চাল—আগামী দিনে রাজ্যের ক্ষমতা ও সাংগঠনিক সমীকরণ কোন দিকে নিয়ে যায়, সেদিকেই এখন নজর সবার।

