প্রতিদিনের ডেস্ক:
রাজধানীর পল্লবীতে শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছে, মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিরঙ্কুশভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাই তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে এ কথা বলেন রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু। তিনি বলেন, মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানার মুখে উঠে আসা ‘ডলার’ প্রসঙ্গটি বিচারপ্রক্রিয়াকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা।আদালত সূত্রে জানা যায়, মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকাল ৯টার দিকে কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। পরে তাদের ঢাকা দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। বহুল আলোচিত এ মামলাকে কেন্দ্র করে আদালত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।পরে সকাল ১১টা ২০ মিনিটে সোহেল রানাকে এবং ১১টা ৩৮ মিনিটে স্বপ্না আক্তারকে আদালতের এজলাসে তোলা হয়। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। এরপর সকাল ১১টা ৪৪ মিনিটে বিচারক এজলাসে প্রবেশ করলে মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়।শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক গঠিত চার্জ প্রমাণের জন্য সাক্ষীদের মাধ্যমে যে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে অপরাধের প্রয়োজনীয় উপাদান সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ‘চেইন অব ফ্যাক্ট’ বা পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।তিনি বলেন, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় একজন আসামির বক্তব্য দেওয়ার নির্দিষ্ট কয়েকটি সুযোগ থাকে। কিন্তু ১ নম্বর আসামি সোহেল রানা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে কোথাও ‘ডলার’ নামের কোনো ব্যক্তির কথা বলেননি। অথচ ৩৪২ ধারায় আসামি পরীক্ষার সময় তিনি ওই নামের উল্লেখ করেছেন। এটি জেলখানায় কোনো কুচক্রী ব্যক্তির পরামর্শে বলা হয়ে থাকতে পারে এবং আদালতের বিবেচনায় এর কোনো ভিত্তি নেই।রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, সাক্ষ্য-প্রমাণে স্পষ্ট হয়েছে যে সোহেল রানা তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের সহায়তায় ভিকটিম রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ, হত্যা এবং পরে মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে গুম করার চেষ্টা করেন।আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ঘটনাটি ঘটেছে আসামিদের বসবাস করা ফ্ল্যাটে, যা ভিকটিমের পরিবারের ফ্ল্যাটের বিপরীতে অবস্থিত। সাক্ষ্য অনুযায়ী ওই ফ্ল্যাটের বাকি দুটি কক্ষ তালাবদ্ধ ছিল এবং আসামিদের ব্যবহৃত কক্ষ ছাড়া সেখানে অন্য কারও উপস্থিতি ছিল না। ফলে এভিডেন্স অ্যাক্টের ১০৬ ধারা অনুযায়ী ফ্ল্যাটের ভেতরে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে ‘স্পেশাল নলেজ’ বা বিশেষ জ্ঞান আসামিদের কাছেই রয়েছে।তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের বিভিন্ন নজির অনুযায়ী কারও হেফাজত বা সান্নিধ্যে থাকা অবস্থায় মৃত্যু ঘটলে সেই মৃত্যুর ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর বর্তায়। কিন্তু এই মামলায় রামিসার মৃত্যু কিংবা তার মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করার বিষয়ে আসামিদ্বয় আদালতে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়ায় রেকর্ড করা ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আসামিদের অপরাধে সংশ্লিষ্টতাকে দিবালোকের মতো স্পষ্ট করেছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত ও প্রয়োজনীয় তথ্যাদির মাধ্যমে প্রসিকিউশন আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিরঙ্কুশভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।তিনি বলেন, আসামিপক্ষ দাবি করেছে ঘটনার সময় সোহেল রানা নেশাগ্রস্ত ছিলেন। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তার জবানবন্দি কিংবা মামলার কোনো সাক্ষ্যে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই এই দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।দুলু বলেন, আসামিপক্ষ অপরাধ স্বীকার করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আবেদন জানালেও রাষ্ট্রপক্ষ ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য উভয় আসামির বিরুদ্ধে আইনে নির্ধারিত সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানিয়েছে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ আদালতে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা ছুরিটির ফরেনসিক পরীক্ষা হয়নি। তিনি এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সোহেল রানার ক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্বপ্না আক্তারের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী শাস্তির আবেদন জানান।শুনানি শেষে বিচারক আগামী রোববার ৭ জুন রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন। রাষ্ট্রপক্ষ আশা প্রকাশ করেছে, ট্রাইব্যুনাল সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে একটি যথাযথ ও দৃষ্টান্তমূলক রায় দেবেন।

