২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

১৯৭০ বিশ্বকাপের সেই গোল, ৫৬ বছর পরেও মানুষ কেন বারবার দেখে

প্রতিদিনের ডেস্ক:
১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতালির বিরুদ্ধে ব্রাজিলের চতুর্থ গোলটা দেখার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এটি প্রতিবার দেখলে নতুন কিছু চোখে পড়ে, নতুন কোনো মুহূর্ত হৃদয় ছুঁয়ে যায়, নতুন কেউ নায়ক হয়ে ওঠেন। গোলটির শেষ নোটটি বাজিয়েছিলেন শক্তিশালী ও দাপুটে ক্যাপ্টেন কার্লোস আলবার্তো, যার ডান পায়ের শটে এত গতি ছিল যে মারার পরেও তিনি মাটি ছেড়ে ছিলেন। কিন্তু প্রথম নোটটি বাজিয়েছিলেন একজন খাটো ও টাকমাথা ফরোয়ার্ড, তোস্তাও বা লিটল কয়েন নামে পরিচিত। বাম চোখ প্রায় অন্ধ এই মানুষটি পরে চক্ষুবিশেষজ্ঞ হয়েছিলেন। সেদিন তিনি প্রতিপক্ষের বক্সের কাছে হেঁটে বেড়াচ্ছিলেন, ব্রাজিল তখন ৩-১ গোলে এগিয়ে, মাত্র চার মিনিট বাকি। তখনই তিনি দেখলেন ইতালির মিডফিল্ডার আন্তোনিও জুলিয়ানো ডান দিক ধরে ছুটছেন। কী একটা যেন তাকে তাড়িত করল, প্রচণ্ড রোদে অ্যাজটেকার মাঠে ৪০ গজ ছুটে গেলেন, জুলিয়ানোর জার্সি ধরে টান দিলেন, পাশ থেকে ট্যাকেল করে বল কেড়ে নিয়ে পাস করলেন সেন্টার ব্যাক উইলসন পিয়াজার কাছে।
ক্লোদোয়ালদোর দশ সেকেন্ডের জাদু, চারজন ইতালিয়ানকে কাটিয়ে
পিয়াজার ভূমিকাটা হয়তো সবচেয়ে সাদামাটা ছিল এই ৩৭ সেকেন্ডের যাত্রায়। কিন্তু তার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটা ছিল বল গোলরক্ষক ফেলিক্সকে না দেওয়া। পিয়াজা মাথা ঘুরিয়ে ফেলিক্সের দিকে তাকালেন, প্রায় বল দিতে যাচ্ছিলেন, তারপর মন বদলে দিলেন ক্লোদোয়ালদোর কাছে। এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারই আগে বাজে ব্যাক-হিল করে ইতালির একমাত্র গোলে সহায়তা করেছিলেন। ক্লোদোয়ালদো বল পেলের কাছে ঠেলে দিলেন। পেলে সাহায্য করতে পিছিয়ে এসেছিলেন। তিনি বলটা গের্সনের কাছে দিলেন, গের্সন ফিরিয়ে দিলেন ক্লোদোয়ালদোকে।
এরপর সেই দশ সেকেন্ড। ক্লোদোয়ালদো কাঁধ নাড়লেন, ছলনায় ইতালিয়ানদের কাছে টানলেন, তারপর বুনেলেন জাদু। জিয়ান্নি রিভেরাকে কাটিয়ে গেলেন, আঞ্জেলো ডোমেনঘিনি ও জিয়ানকার্লো দে সিস্তিকে পেছনে ফেললেন, জুলিয়ানোকে ডামি দিলেন, বাঁয়ে সরে রিভেলিনোর কাছে বল দিলেন। পরে ক্লোদোয়ালদো বলেছিলেন, ইতালি প্রেসিং করছিল, আমি যখন চারপাঁচজনকে কাটিয়ে দিলাম, জায়গা তৈরি হলো, তারপর রিভেলিনোকে পাস দিলাম। রিভেলিনো ফ্ল্যাংক ধরে যাননি, বরং ৪০ গজ সরাসরি পাস দিলেন জায়ের্জিনহোকে।
জায়ের্জিনহো থেকে পেলে, তারপর আলবার্তোর সেই রকেট শট
জায়ের্জিনহো ছিলেন ডান উইঙ্গার কিন্তু বামে খেলছিলেন। কোচ মারিও জাগালো ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে এদিকে রেখেছিলেন যাতে ইতালির বাম ব্যাক ফাচেত্তিকে ব্যস্ত রাখা যায় এবং আলবার্তোর সামনে ডান দিকে জায়গা তৈরি হয়। জায়ের্জিনহো বল পেলেন, ফাচেত্তিকে কাটলেন, বক্সের কিনারা থেকে পেলের কাছে বল দিলেন। সামনে হলুদ ও নীল জার্সি, পিছনে তোস্তাও ভ্রু নাচিয়ে ইঙ্গিত করলেন আলবার্তোর আসার কথা। পেলে বল পায়ে নাচালেন, তিনটি টাচ নিলেন, তারপর ডানদিকে গড়িয়ে দিলেন। যখন বল ছেড়েছিলেন, আলবার্তো ক্যামেরার ফ্রেমেই ছিলেন না।
এই গোল আসলে দুর্ঘটনা নয়, অনুশীলনে পরিকল্পনা করা ছিল
পেলে জানতেন আলবার্তো আসবেন। আলবার্তো জানতেন পাস আসবে। আলবার্তো পরে বলেছিলেন, পেলে জানত আমি আসছি, ম্যাচের আগেই কথা হয়েছিল আমাদের। জাগালো বিশ্বকাপের প্রতিটি প্রতিপক্ষের অনুশীলন শিবিরে গুপ্তচর পাঠাতেন। ইতালির ক্যাম্পে গিয়েছিলেন ভবিষ্যতের বিশ্বকাপজয়ী কোচ কার্লোস আলবার্তো পেরেইরা, দলের শারীরিক প্রশিক্ষক। আলবার্তো বলেছেন, আমরা আগেই জানতাম এটা ঘটতে পারে, কারণ আমরা জানতাম ইতালি কীভাবে খেলে। সেই রকেট শট বারবার দেখেছিলেন আলবার্তো, কিন্তু সম্পূর্ণ বুঝতে পারতেন না তার সৌন্দর্য। ২০১৪ সালে বলেছিলেন, গোলটা করার সময় আবেগ ছিল অসাধারণ, কিন্তু ম্যাচের পরে এবং আজও বুঝি এই গোলটা কতটা সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সবাই এখনো এটা নিয়ে কথা বলছে। ২০১৬ সালে মৃত্যুর দুই বছর আগেও বলেছিলেন এই কথা।
এই গোল ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সব সৌন্দর্যকে এক জায়গায় এনেছে, দৃষ্টিভঙ্গি, শক্তি, দক্ষতা ও প্রাণশক্তির পাগল করা মিশেল। প্রতিটি দেখায় নতুন স্তর উন্মোচিত হয়, নতুন কেউ নায়ক হন।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়