২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

শ্রমবাজারে যুদ্ধের প্রভাব

আমাদের দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। আবার সেই শ্রমবাজারের প্রায় পুরোটাই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। সংগত কারণে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শ্রমবাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। নতুন শ্রমিক পাঠানো প্রায় বন্ধ, সেই সঙ্গে পুরনো অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়ে পথে বসার উপক্রম। এর সরাসরি ধাক্কা লেগেছে দেশের অর্থনীতিতে। এই পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে কবে, কখন এই সংকটের সুরাহা হবে, তার কোনো দিশা নেই। গতকাল প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলোর নতুন কর্মীর চাহিদা ব্যাপক হারে কমে গেছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন এক লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি কর্মী। অথচ এর আগের বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল দুই লাখ ৬০ হাজার ৪৩৮। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৪১ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবকাঠামো নির্মাণ কমেছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে খরা, সেবা খাত বিপর্যস্ত—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে পড়েছে। আবার এদিকে আগের তুলনায় বিমানভাড়াও অনেক বেড়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিদেশ গমন বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সেক্রেটারি মাজহারুল ভূইয়া বলেন, ‘আমাদের সৌদি আরব রুট এখন অনেকটা বন্ধের মুখে। যুদ্ধের কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে ওখানে কাজ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
’ অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর জানিয়েছেন, বাংলাদেশের শ্রমবাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক এবং সবচেয়ে বড় নির্ভরতা সৌদি আরবের ওপর। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আমাদের শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, ঝুঁকি কমানো এবং বিকল্প বাজার তৈরি নিয়ে নানা সময় আলোচনা হলেও এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি।
প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলেও দক্ষ জনবল তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেই। কিন্তু বৈশ্বিক বাস্তবতা হলো, অদক্ষ শ্রমিকদের কাজের অভাব হলেও দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে বিশ্বব্যাপী। আইটি, কেয়ারগিভিং, নার্সিং এবং ড্রাইভিংয়ের মতো প্রশিক্ষিত কর্মীর কাজের সুযোগ রয়েছে অনেক দেশেই। এ ছাড়া আমাদের দেশের শ্রমিকরা বিদেশের মাটিতে নানা সময় প্রতারণার শিকার হন। সেই সময় প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা পান না। মানবেতর পরিবেশে কাজ করা এবং থাকা-খাওয়ার কষ্ট প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য একপ্রকার নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কারণেও অনেকে বিদেশে গিয়ে কাজ করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। আমরা মনে করি, দেশের জনশক্তি রপ্তানিতে খরা কাটাতে হলে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা থেকে বের হয়ে বিকল্প শ্রমবাজারের সন্ধান করতে হবে। অনেক দেশে দক্ষ কর্মীর বিপুল চাহিদা রয়েছে। সেই চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরি করতে উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রবাসে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা, সুস্থ কর্মপরিবেশ—সর্বোপরি শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষায় সরকারকে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়