আবু সাঈদ মো. নাজমুল হায়দার
ফুটবলকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি বৈশ্বিক সংস্কৃতি, অর্থনীতি, গণমাধ্যম, জাতীয় পরিচয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক বিশাল মিলনমেলা। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে যে উত্তেজনা চলছে, তখন তার ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশও। বরং বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করেও যে কয়েকটি দেশে বিশ্বকাপ নিয়ে সবচেয়ে বেশি উন্মাদনা দেখা যায়, বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে তাদের অন্যতম।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের খেলা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর, মফস্বল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ জনপদে ফুটবল জ্বর ছড়িয়ে পড়েছে। বাজারে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল ও ইংল্যান্ডের জার্সি এবং পতাকা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয়ে গেছে সমর্থকদের যুক্তি-তর্ক, পরিসংখ্যানের লড়াই, ট্রল ও মিম যুদ্ধ। বাংলাদেশের জনজীবনে বিশ্বকাপ যেন রীতিমতো একটি সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশে ফুটবল সমর্থনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার প্রতি মানুষের আবেগ অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এর পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং গণমাধ্যমগত প্রভাব। ১৯৭০-এর দশকে পেলের ব্রাজিল এবং ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরী নৈপুণ্য বাংলাদেশে লাখো সমর্থক তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে রোমারিও, রোনালদো, রোনালদিনহো, কাকা ও নেইমার যেমন ব্রাজিলের জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছেন, তেমনি বাতিস্তুতা, ক্যানিজিয়া থেকে শুরু করে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক সাফল্য নতুন প্রজন্মের সমর্থকদের আকৃষ্ট করেছে।
বাংলাদেশের সমাজে ফুটবল সমর্থন অনেকাংশে পারিবারিক উত্তরাধিকারেও পরিণত হয়েছে। বাবার সমর্থিত দল সন্তানের সমর্থিত দল হয়ে ওঠে। ফলে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু খেলার মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পারিবারিক আড্ডা, বন্ধুমহল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রেও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
বিশ্বকাপকে ঘিরে দেশের বাজারে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হয়, সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। জার্সি, পতাকা, ব্যানার, স্টিকার, ক্যাপ, বাঁশি, ব্যান্ড এবং অন্যান্য সামগ্রীর বিক্রি কোটি টাকার বাজার সৃষ্টি করে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় আমদানিকারক—সবার জন্য বিশ্বকাপ একটি মৌসুমি অর্থনৈতিক সুযোগ। রাজধানীর গুলিস্তান, নিউমার্কেট কিংবা চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনার বিভিন্ন বাজারে বিশ্বকাপকেন্দ্রিক ব্যবসা এখন একটি সুপরিচিত অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
তবে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ সংস্কৃতির সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশ হলো পতাকা উড়ানো। বিশ্বকাপ এলেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা অন্যান্য দেশের বিশাল বিশাল পতাকা টানানো হয়। কখনো কখনো কয়েকশ ফুট দীর্ঘ পতাকা তৈরি করে রেকর্ড গড়ার চেষ্টাও দেখা যায়। বিদেশি গণমাধ্যমেও একাধিকবার বাংলাদেশের এই ‘ফুটবল প্যাশন’ সংবাদ শিরোনাম হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, কেন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশগুলোর প্রতি বাংলাদেশের মানুষের এত আবেগ?
এর উত্তর খুঁজতে হলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—‘সফট পাওয়ার’—এর দিকে তাকাতে হয়। মার্কিন রাজনৈতিক বিজ্ঞানী জোসেফ নাই-এর মতে, কোনো রাষ্ট্র কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে নয়; সংস্কৃতি, ক্রীড়া, শিক্ষা ও মূল্যবোধের মাধ্যমেও অন্যদের আকৃষ্ট করতে পারে। ফুটবল আজ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন কিংবা পর্তুগালের সফট পাওয়ারের অন্যতম প্রধান উৎস।ব্রাজিলের কথাই ধরা যাক। বিশ্বের বহু মানুষ দেশটির অর্থনীতি বা রাজনীতি সম্পর্কে খুব বেশি জানেন না, কিন্তু ব্রাজিল বলতেই তাদের চোখে ভেসে ওঠে সাম্বা, কার্নিভাল এবং সুন্দর ফুটবল। একইভাবে আর্জেন্টিনা বলতে ম্যারাডোনা ও মেসির নামই প্রথম মনে আসে। অর্থাৎ ফুটবল একটি দেশের ইতিবাচক জাতীয় ব্র্যান্ড নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশের মানুষের সমর্থনও মূলত: এই সফট পাওয়ারেরই প্রতিফলন। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে খুব গভীরভাবে সম্পৃক্ত না হলেও ফুটবলের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এটি সাংস্কৃতিক কূটনীতির একটি কার্যকর উদাহরণ।
বিশ্বকাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো গণমাধ্যম। বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন পোর্টাল, সংবাদপত্র এবং এফএম রেডিওগুলো বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান, বিশ্লেষণ, ফিচার এবং সাক্ষাৎকার প্রচার করছে। বিশ্বকাপকে ঘিরে বিজ্ঞাপন বাজারও সক্রিয় হয়ে ওঠে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ফুটবল-ভিত্তিক প্রচারণা চালায়, যা বিপণন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই উন্মাদনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও এক্সে সমর্থকদের বিতর্ক এখন বিশ্বকাপ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেউ মেসির পরিসংখ্যান তুলে ধরছেন, কেউ নেইমার বা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের নৈপুণ্যের প্রশংসা করছেন, আবার কেউ রোনালদো বা এমবাপ্পেকে সামনে এনে যুক্তি উপস্থাপন করছেন। এ এক নতুন ধরনের ডিজিটাল জনপরিসর, যেখানে ফুটবল হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম ভাষা।
তবে এই উন্মাদনার কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, বেপরোয়া মিছিল কিংবা সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা মাঝে মাঝে সংবাদ শিরোনাম হয়। ফুটবলপ্রেম কখনোই জননিরাপত্তা বা সামাজিক সম্প্রীতির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে না। উৎসবের আনন্দ অবশ্যই দায়িত্বশীল আচরণের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ নিজেই একটি ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই আসর। আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। তিন দেশের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপ উত্তর আমেরিকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতারও প্রতীক। বৈশ্বিক ক্রীড়া কূটনীতির ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বিশ্বকাপ আজ শুধু খেলোয়াড়দের প্রতিযোগিতা নয়; এটি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নির্মাণ, আন্তর্জাতিক পর্যটন বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং জাতীয় ব্র্যান্ডিংয়ের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ দেখিয়েছে কীভাবে একটি ছোট রাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী নিজেদের পরিচিতি ও প্রভাব বাড়াতে ক্রীড়াকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে পারে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও একই ধরনের ভূ-রাজনৈতিক বার্তা পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশের জন্যও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের এই দেশে ফুটবলের প্রতি যে বিপুল আগ্রহ রয়েছে, তা দেশের নিজস্ব ফুটবল উন্নয়নের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো যেতে পারে। বিশ্বকাপ নিয়ে কোটি কোটি মানুষের আবেগ যদি ঘরোয়া ফুটবল অবকাঠামো উন্নয়ন, তৃণমূল পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরির উদ্যোগ এবং পেশাদার লিগ শক্তিশালী করার দিকে পরিচালিত করা যায়, তবে একদিন বাংলাদেশও হয়তো এশিয়ার ফুটবলে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬ তাই বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি ক্রীড়া আসর নয়। এটি সামাজিক সম্প্রীতির উৎসব, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রকাশ এবং বৈশ্বিক সংযোগের এক অনন্য মঞ্চ। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কিংবা অন্য যে দলেরই সমর্থক হই না কেন, বিশ্বকাপ আমাদের শেখায় বৈচিত্র্যের মধ্যেও সহাবস্থান সম্ভব। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতে পারে, কিন্তু বিভাজন নয়; আবেগ থাকতে পারে, কিন্তু বিদ্বেষ নয়।
বিশ্বকাপের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই—এটি পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, জাতি ও রাষ্ট্রকে একটি বলের চারপাশে একত্রিত করতে পারে। আর সেই বৈশ্বিক মিলনমেলার এক উজ্জ্বল অংশীদার বাংলাদেশ।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

