বাবা দিবসের গল্প: বাবার ডায়েরি

সাখাওয়াত হোসেন সজীব
সন্ধ্যা নেমে আসছে, অফিস থেকে ঘেমে-নেয়ে বাসায় ফিরছি। বাসার সামনে বাচ্চারা খেলছে, আমার ছেলেও। নজরে আসতেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলো। বলতে লাগলো, তার সব বন্ধুর বাবা অফিস থেকে এসে তাদের আইসক্রিম কিনে দেয়। তার ইশারা বুঝলাম। বললাম, ‘বাজারে যাচ্ছি। আসার সময় আইসক্রিম নিয়ে আসবো।’ এবার নতুন বায়না, আমার সাথে বাজারে যাবে। চোখগুলো ছোট করে এমন ভাবে বলে, মানা করি কিভাবে? বাজারে যাচ্ছি বাপ-ছেলে। তার কথার ফুলঝুড়ি চলছে, ‘বাবা জানো, আজ কী হয়েছে?’ দিয়ে শুরু। এরপর কোথায় গিয়ে শেষ হবে আল্লাহ জানে।
ঘরে মাছ শেষ। তাই দু’পদের মাছ কিনলাম। মুদি দোকানে সদায় কিনছি। হঠাৎ খেয়াল হলো, ছেলেটা পাশে নেই। এদিক-ওদিক খুঁজে আমি হয়রান। ভয়ে মাথা ঘুরছে। তখন দেখি মাছের বাজারে তিনি কই মাছের লাফানি দেখছে। মানুষের স্বস্তি আর রাগ একসাথেও যে অনুভূত হতে পারে; সেদিন আমি বুঝলাম। কাছে গিয়েই দিলাম চরম ধমক। ও খুব ভয় পেয়ে গেল। কান্না করে দিলো। বাজার থেকে বাসায় ফেরার পথে সে চুপ। বাসায় ওঠার সময় একটা কোন আইসক্রিম কিনে দিলাম। নীরব মুখে যেন হাসি ফিরলো। কিন্তু বাবার ভয়ে কিছু বললো না।
বাসায় এসে ফ্রেশ হলাম। ছেলেও চলে গেল পাশের রুমে পড়তে। শুনলাম, ওর মা জিজ্ঞেস করছে, ‘বাইরে গিয়ে এদিক-সেদিক যাও, ভয় হয় না?’ ছেলের নির্ভীক জবাব, ‘বাবা থাকতে কিসের ভয়? বাবা আছে তো সব ঠিক।’ কথাটা শুনে মনের অজান্তেই হেসে দিলাম।
বাবা দিবসের গল্প: জীবনের স্থপতি
টিভিটা ছাড়লাম। এমন সময়ে মা এসে বললো, ‘আজ পুরোনো ড্রয়ার গোছাতে গিয়ে তোর বাবার একটা ডায়েরি হাতে পেলাম। সময় পেলে পড়ে দেখিস।’ মনে পড়লো ২৮ বছর আগে বাবা মারা গেছেন। আমার ছোটবেলা থাকতেই। কোনো স্মৃতি আর বেঁচে নেই। মায়ের হাত থেকে নিলাম ডায়েরি। রাতে খাবারের পর আরামসে পড়া যাবে।
খাওয়া শেষে ড্রয়িংরুমে ডায়েরি নিয়ে বসলাম। কত কিছু লেখা। কার কাছে কত পাবে, কত দিতে হবে। আরও কত কী। হঠাৎ এক পৃষ্ঠায় লেখা দেখলাম: ‘আজ অফিস শেষে বাসায় ফেরার সময় নিচে বাবু খেলছিল, আমাকে দেখামাত্রই পাইপ আইসক্রিম খাওয়ার বায়না ধরলো, অনেক বোঝালাম এগুলো ময়লা পানি দিয়ে বানায়, পেট খারাপ করবে কিন্তু বাবু চোখগুলো ছোট ছোট করে এমনভাবে চাইলো, না বলতে পারলাম না।’
আমি হেসে দিলাম। আরও কিছু পাতা ওল্টালাম। আরেক পাতায় লেখা: ‘আজ মন খুব খারাপ। এই প্রথম বাবুকে চড় মেরেছি। খুব রাগ উঠেছিলো। বারবার বলেছি গরুর হাটে নিয়ে যাবো এক শর্তে; আমার হাত ছাড়বি না আর সে হাত ছেড়ে অন্য আরেক গরু দেখছে। আধাঘণ্টা খোঁজাখুঁজি করে পেলাম বাবুকে। প্রথমে তো জড়িয়ে ধরেছি। তারপর দিলাম ঠাটিয়ে চড়। বেচারা কাঁদতে কাঁদতে ফিরেছে। রাতে ঘুমানোর সময় খুব করে চেয়েছি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে, সে সরিয়ে দিয়েছে। সব সময় সরিয়ে দেয়, তার নাকি বাবার দাড়ি আর গোঁফের গুতা লাগে… হা হা হা। বাবারে তুই যদি বুঝতি, তোর বাবার কী যে ইচ্ছা তোকে জড়িয়ে একটা রাত ঘুমাবো…’
আব্বার স্মৃতি, আমার ভেতরের আলো
লেখা পড়ার ফাঁকে কখন যে চোখ দিয়ে পানি পড়লো খেয়াল করলাম না। মনের ভেতর কেমন এক শূন্যতা কাজ করলো। জানি না কিসের এক অপরাধবোধ গ্রাস করলো আমাকে।
ঘুমাতে চলে গেলাম। ছেলে ও তার মা ঘুমিয়ে পড়েছে। কেন জানি ছেলেটাকে বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুমাতে মন চাইলো, টেনে নিলাম বুকে। ছেলে ঘুমন্ত অবস্থায় ঠেলে দিলো। আরেকবার কাছে টানলাম। এবার সরে গিয়ে বিরক্ত ঘুমমুখে বললো, ‘বাবা সরো, তোমার দাড়ি আর গোঁফের খোঁচা লাগে।’

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়