উৎপল মণ্ডল,শ্যামনগর
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় ১ হাজার ৯০ জন কৃষকের মাঝে ফলজ ও ঔষধি গাছের চারা, কম্পোস্ট সার ও অন্যান্য উপকরণ বিতরণ করা হচ্ছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ কর্মসূচির জন্য মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০ লাখ ২৩ হাজার টাকা। তবে উপকরণ ক্রয় ও মূল্য নির্ধারণে বাজারদরের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে কম্পোস্ট সারের মূল্য এবং বাঁশের খুঁটির দাম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কৃষক, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল। যদিও উপজেলা কৃষি বিভাগ বলছে, সরকারি অনুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সব উপকরণ ক্রয় ও বিতরণ করা হয়েছে।০১ জুলাই (বৃহস্পতিবার) সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিটি কৃষককে পাঁচটি করে ফলজ ও ঔষধি গাছের চারা, একটি করে ৪০ কেজির কম্পোস্ট সারের বস্তা এবং প্রতিটি চারার জন্য একটি করে মোট পাঁচটি বাঁশের আগা দেওয়া হচ্ছে। সে হিসেবে ১ হাজার ৯০ জন কৃষকের জন্য বিতরণ করা হচ্ছে ১ হাজার ৯০টি কম্পোস্ট সারের বস্তা এবং ৫ হাজার ৪৫০টি বাঁশের আগা। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ৪০ কেজির কম্পোস্ট সারের (বেসরকারি কোম্পানি এসিআই) মূল্য ধরা হয়েছে ৬০০ টাকা, প্রতিটি বাঁশের আগার মূল্য ৫০ টাকা, প্রতিটি নারকেলের চারার মূল্য ১৬০ টাকা এবং কদবেল, মাল্টা, জলপাই, আম, সবেদা, তেঁতুল, অর্জুন, জাম, নিম, বরই, আমলকিসহ অন্যান্য ফলজ ও ঔষধি গাছের চারার মূল্য ধরা হয়েছে ৩০ টাকা করে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাঁশ সংগ্রহ করা হয়েছে পার্শ্ববর্তী কালীগঞ্জ উপজেলার কুশুলিয়া, পারুলগাছা ও বিষ্ণুপুর এলাকা থেকে। নারকেলের চারা কেনা হয়েছে বিএডিসি থেকে, অন্যান্য চারা সংগ্রহ করা হয়েছে হর্টিকালচার সেন্টার থেকে এবং কম্পোস্ট সার সরাসরি এসিআই কোম্পানির কাছ থেকে ক্রয় করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের হিসাবে ১ হাজার ৯০টি কম্পোস্ট সারের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। কিন্তু স্থানীয় বাজার ঘুরে এবং একাধিক সার বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একই ব্র্যান্ডের ৪০ কেজির কম্পোস্ট সার ৪৮০ থেকে ৫৩০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। একই ধরনের অন্যান্য ব্র্যান্ডের কম্পোস্ট সারও ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৫৩০ টাকা ধরলেও ১ হাজার ৯০টি সারের মোট মূল্য দাঁড়ায় ৫ লাখ ৭৭ হাজার ৭০০ টাকা। সে হিসাবে সরকারি হিসাবে ধরা মূল্য ও বাজারদরের মধ্যে পার্থক্য দাঁড়ায় প্রায় ৭৬ হাজার ৩০০ টাকা। একইভাবে প্রকল্পে ৫ হাজার ৪৫০টি বাঁশের খুঁটির প্রতিটির মূল্য ধরা হয়েছে ৫০ টাকা। এতে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৭২ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ স্থানীয় একাধিক বাঁশ ব্যবসায়ীর দাবি, বিতরণ করা মানের বাঁশের আগার বাজারমূল্য ১০ থেকে ১৫ টাকার বেশি নয়। সর্বোচ্চ ১৫ টাকা ধরলেও ৫ হাজার ৪৫০টি বাঁশের মোট মূল্য দাঁড়ায় ৮১ হাজার ৭৫০ টাকা। সে হিসেবে সরকারি হিসাবে ধরা মূল্য ও বাজারদরের মধ্যে পার্থক্য দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার ৭৫০ টাকা। সার ও বাঁশ এই দুই উপকরণের মূল্য একত্রে বিবেচনা করলে সরকারি হিসাবে (উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী) ধরা মূল্য ও স্থানীয় বাজারদরের মধ্যে সম্ভাব্য পার্থক্যের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৬৭ হাজার ৫০ টাকা। তবে এই পার্থক্যই আর্থিক অনিয়মের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। বিষয়টি নিশ্চিত হতে ক্রয়াদেশ, দরপত্র, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মূল্যতালিকা, পরিবহন ব্যয়, ভ্যাট-ট্যাক্স এবং সরকারি অনুমোদিত দর যাচাই করা প্রয়োজন। যেটি দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়ালিউল ইসলাম। এদিকে কয়েকজন কৃষকের অভিযোগ, কর্মসূচিতে গোবরভিত্তিক জৈব সার দেওয়ার কথা থাকলেও তাদের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কম্পোস্ট সার দেওয়া হয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় কী ধরনের সার বিতরণের কথা উল্লেখ রয়েছে, সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। এবিষয়ে গাছের চারা, সার ও অন্যান্য উপকরণ বিতরণসংক্রান্ত কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির সরকারি আদেশ (জি.ও)-এর অনুলিপি চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। ফলে সরকারি নির্দেশনায় কী ধরনের উপকরণ, কীভাবে মূল্য নির্ধারণ এবং কোন মানদণ্ড অনুসরণের কথা বলা হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়ালিউল ইসলাম বলেন, সরকারি নির্দেশনা ও অনুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। মূল্য নির্ধারণ ও ক্রয়সংক্রান্ত বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন অনুযায়ী হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনক বলেন, উপজেলার প্রধান কর্মকর্তা হওয়ায় বিভিন্ন প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে আমাকে রাখা হয়। এই প্রকল্পেও আমি সভাপতি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনেছি, সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী এবং ভালো মানের উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। তবে আপনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখব। কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
