প্রতিদিনের ডেস্ক:
জুলাই আন্দোলনে নিহতদের দৃশ্যমান বিচারের দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা। এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানান তারা। বলেন, গণহত্যার বিচার ছাড়া কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলুপ্তি সম্ভব নয়।শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার’ ও ‘আমরা জুলাইযোদ্ধা’ কেন্দ্রীয় কমিটির আয়োজনে জুলাই আন্দোলনে নিহতদের স্মরণসভায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে তারা এ আহ্বান জানান। পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেকে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। এ সময় অনুষ্ঠানস্থলে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে।অনেকে অভিযোগ করেন জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে আন্দোলন করেছেন। কিন্তু দৃশ্যমান কিছুই হয়নি। জুলাই এলেই চোখের অশ্রু ঝরে। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তাদের পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। এসব পরিবারের প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের আহ্বান জানান তারা। তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন প্রধানমন্ত্রী।রংপুরের আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, আমার ভাই ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবন দেয়। তার অনুপ্রেরণায় আরও অনেক ভাই জীবন দিয়েছেন পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। অনেক শহীদ পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আমার ভাই হত্যার দ্রুত বিচার করুন। সারা দেশে জুলাই যোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণ করার দাবি জানান তিনি।শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আব্দুল রব মিয়া বলেন, জুলাই এলেই চোখের অশ্রু ধরে রাখা যায় না। ৫ আগস্ট আমার ছেলের বুকটা গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল পুলিশ। আমি এক হতভাগা বাবা এই অন্যায়ের বিচার চাই, প্রতিটি জুলাই যোদ্ধা হত্যার বিচার চাই।চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, আমার ছেলে শহীদ হয়েছে। আর কোনও বাবা-মায়ের কোল যেন খালি না হয়। তিনি বলেন, হাত-পা হারানো জুলাই যোদ্ধাদের সহায়তা করুন। তারা যেন কষ্টে না থাকে।শহীদ আব্দুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, আমার বড় ছেলে জাহিদ মারা যাওয়ার পর ছোট ছেলের ক্যানসার ধরা পড়ে। আমি অসহায় অবস্থায় ওই সময় এমন কোনও দরজা নেই যে যাইনি, কিন্তু সহায়তা পাইনি। তবে আমার বিএনপি পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্য আমাদের পাশে ছিলেন।শহীদ আলভীর বাবা আবুল হাসান বলেন, আমার ছেলে ৪ আগস্ট মিরপুরে শহীদ হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার বিচারের বিষয়ে কোনও উদ্যোগ নেয়নি। দুই বছরেও কোনও বিচার হলো না। আমরা তখন আশায় বুক বেঁধেছিলাম, তারেক রহমান দেশে ফিরবেন, ক্ষমতায় বসবেন আমাদের সন্তান হত্যার বিচার করবেন। আমরা আশা রাখি, তিনি আমাদের চোখের পানির মূল্য দেবেন।শহীদ মিরাজের বাবা রব মিয়া, শহীদ সেলিমের ভাই উজ্জ্বল হোসেন, জুলাই আহত আল মিরাজ, জুলাই যোদ্ধা আমিনুল ইসলাম ঈমন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্মরক গ্রহণ করেন। পরে উপস্থিত সবার জন্য রাখা স্মৃতি স্মারক তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়।দুই পা হারানো জুলাই যোদ্ধা শাহীন মালু বলেন, গত ১৭ বছর জিয়া পরিবার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই দেশকে ভালো রাখতে হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে থাকতে হবে। শহীদ পরিবার যদি চায়, তবে তারেক রহমানকে সহায়তা করুন। এই দেশ তার কাছেই নিরাপদ।আহত জুলাই যোদ্ধা মিল্লাত হোসেন জানান, তিনি একজন আহত জুলাই যোদ্ধা। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের দাবিতে নয়াপল্টন থেকে মিছিল নিয়ে প্রেসক্লাব যাওয়ার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। জানান, তখন তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। কিন্তু কোনও হাসপাতালে চিকিৎসা পাননি। প্রথমে পরিবারকে জানানো হয়, তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। এরপর থেকে তার বাবা অসুস্থ হয়ে শয্যাশয়ী হন, পরে মারা যান। তারা শুধু জুলাই যোদ্ধা নন, গত ১৭ বছরের যোদ্ধা। সব জুলাই যোদ্ধা হত্যার বিচার চান তিনি।আহত জুলাই যোদ্ধা সুজন মোল্লা বলেন, লন্ডন থেকে তারেক রহমান একদফা ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ জন্যই আন্দোলন করেছিলাম। এই একদফা বাস্তবায়ন হয়েছে বলেই স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। জুলাই শহীদ পরিবার থেকে শুরু করে দেশের মানুষ নিরাপদে বাস করছে। তবে আমাদের আক্ষেপ থেকেই গেছে। শহীদ যোদ্ধাদের হত্যার বিচার এখনও হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী চাইলেই দ্রুত জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে পারেন।আহত আলামিন বলেন, জামায়াত জুলাইকে বিক্রি করে আর বিএনপি জুলাইকে ধারণ করে। আমার একটা হাত নেই, ব্যথায় মাঝেমধ্যে কাঁপতে থাকি। চিকিৎসা করাতে পারি না। আমার মতো কত-শত যোদ্ধা এমন হাত পা হারিয়েছেন ঠিক নেই। তিনি হাত-পা হারানোর যোদ্ধাদের চিকিৎসার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দাবি জানান।জুলাই যোদ্ধা মেহেদী হাসান মিরাজ বলেন, একটি রাজনৈতিক দল শহীদ যোদ্ধাদের নাম বিক্রি করে নিজেদের পকেট ভারী করেছে। শুধু জাতীয়তাবাদী দলের সমর্থক হওয়ার কারণে আমাকে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কোনও সহায়তা করা হয়নি, বলা হতো আমরা জুলাই যোদ্ধা নই, বিএনপির লোক। আমাদের সহায়তা করবে বিএনপি।মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন– স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান ও চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।এর আগে, সকাল সোয়া ১০টায় পবিত্র কোরআন থেকে তেলোয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এ সময় জুলাই শহীদদের স্মরণে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। জাতীয় সংগীত এবং জুলাই আন্দোলনের ওপর প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। শহীদ পরিবারের হাতে জুলাই স্মৃতি স্মারক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
