মিথুন দত্ত, অভয়নগর
উন্নয়নের নামে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও যদি নতুন নির্মিত সড়ক ১০ দিনের মাথায় ভেঙে পড়তে শুরু করে, তবে সেই নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। যশোরের অভয়নগর উপজেলার চেঙ্গুটিয়া বুড়োর দোকান–বাহিরঘাট সড়কে ঘটেছে ঠিক এমনই ঘটনা। প্রায় পৌনে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি সড়কের একটি নির্মাণ শেষ হওয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় প্রায় ৩০ মিটার অংশে ধস দেখা দিয়েছে। কোথাও হেজিংয়ের ইট খসে পড়েছে, কোথাও উঠে গেছে পিচ, আবার পুকুরপাড়ের অংশে সড়ক দেবে যাওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন স্থানীয়রা। এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, চেঙ্গুটিয়া বুড়োর দোকান থেকে বাহিরঘাট পর্যন্ত ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার এবং সাভারপাড়া তালেব গাজীর বাড়ি থেকে ভূবন সাহার মোড় পর্যন্ত ৩২৪ মিটার—মোট ২ দশমিক ১২৪ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের জন্য ২০২৩ সালের মে মাসে দরপত্র আহ্বান করা হয়। দুই কোটি ৭৪ লাখ ১৫ হাজার ৩ টাকা চুক্তিমূল্যে কাজ পায় যশোরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সনেক্স ইন্টারন্যাশনাল। ২০২৩ সালের ২০ জুন কাজ শুরু হয়ে ২০২৪ সালের ১৫ মে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুন করা হয়। গত ২৩ জুন নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর এলজিইডি কাজ বুঝে নিয়ে ঠিকাদারকে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করে। শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাহিরঘাট গ্রামের একটি গভীর পুকুরসংলগ্ন অংশে প্রায় ৩০ মিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাকির হোসেনের বাড়ির মোড় থেকে নাজমুস সাকিবের বাড়ি পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে হেজিংয়ের ইট খসে পড়েছে, পিচ ভেঙে গেছে এবং পুকুরপাড়ের অংশে সড়কের মাঝ বরাবর দেবে গেছে। দুর্ঘটনার আশঙ্কায় যানবাহন ও পথচারীরা সড়কের এক পাশ ঘেঁষে চলাচল করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন রাস্তা খুঁড়ে ফেলে রাখার পর সামান্য ইটের খোয়া ও বালু দিয়ে দ্রুত কার্পেটিং করা হয়। পুকুরপাড় যথাযথভাবে মজবুত না করেই কাজ শেষ করা হয়েছে। এ নিয়ে গ্রামবাসী একাধিকবার আপত্তি জানালেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বাহিরঘাট গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কাসেম বলেন, “পুকুরপাড় ঠিকমতো বাঁধাই না করায় আমরা কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। পরে দুই দিনের মধ্যে মজবুত করে দেওয়ার আশ্বাসে কাজ করতে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। এখন রাস্তা ভেঙে পড়ছে।” গ্রামের বাসিন্দা নাজমুস সাকিব বলেন, “আমরা আগে পুকুরপাড় শক্ত করে তারপর পিচ দেওয়ার কথা বলেছিলাম। কিন্তু কেউ কথা শোনেনি। এখন সেই অবহেলার ফল ভোগ করতে হচ্ছে।” কৃষক ওলিয়ার রহমানের অভিযোগ, “নিম্নমানের ইটের খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে, পর্যাপ্ত বালুও দেওয়া হয়নি। প্যালাসাইডিংয়ের পাশে মাটি না থাকায় বৃষ্টিতে রাস্তা ধসে পড়ছে।” আরেক কৃষক মো. সালাউদ্দিন বলেন, “আমরা কাজের সময় বাধা দিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এখন নতুন রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় সবাই দুর্ভোগে পড়েছে।” প্রেমবাগ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “বর্ষার কারণে পুকুরপাড়ের কাজ করা সম্ভব হয়নি। আবহাওয়া ভালো হলে প্রয়োজনীয় কাজ করা হবে।” ঠিকাদারের প্রতিনিধি সেলিম রেজা বলেন, “আমি শুধু কার্পেটিংয়ের কাজ করেছি। পুকুরটি গভীর এবং প্যালাসাইডিং সড়কের খুব কাছে হওয়ায় সমস্যা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে এলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ টেকসইভাবে মেরামত করা হবে।” অভয়নগর উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবু সুফিয়ান বলেন, “পুকুরপাড়ে শোল্ডারে পর্যাপ্ত মাটি না থাকায় বৃষ্টিতে কিছু অংশ ভেঙে গেছে। ঠিকাদারকে দ্রুত মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।” এলজিইডির যশোর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাহাবুবুর রহমান বলেন, “বিষয়টি আমাদের জানা আছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশে মাটি দিয়ে শক্তিশালী করে পুনরায় সংস্কার করা হবে। এ জন্য কাজের মেয়াদও বাড়ানো হচ্ছে।” নির্মাণ শেষ হওয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় কোটি টাকার সড়কের এমন বেহাল চিত্র স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তাঁদের দাবি, শুধু ভাঙা অংশ মেরামত নয়, পুরো নির্মাণকাজের মান তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক, যাতে উন্নয়নের নামে সরকারি অর্থের অপচয় আর না হয়।
