মিথুন দত্ত, অভয়নগর
যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া পৌর এলাকায় মাত্র দুই দিনের টানা বৃষ্টিতেই দেখা দিয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, বাজার থেকে শুরু করে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স—সবখানেই জমেছে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় শত কোটি টাকার ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় প্রতিবছরের মতো এবারও একই দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে পৌরবাসীকে। সরেজমিনে দেখা যায়, নওয়াপাড়া পৌরসভার গুয়াখোলা, বুইকরা, বৌবাজার, কলোনি, ড্রাইভারপাড়া, স্টেশনসংলগ্ন পাইকারি মাছের আড়ত, রাজঘাট, তালতলা ও চেঙ্গুটিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। কোথাও কোথাও যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে হাঁটুপানি জমে থাকায় রোগী ও তাদের স্বজনদের নোংরা পানি মাড়িয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে। ওষুধ সংগ্রহ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে যাতায়াতেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে জলাবদ্ধতা স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলেছে। জলাবদ্ধতার কারণে বৌবাজার জামে মসজিদ, রাজঘাট জামে মসজিদ, শহীদ নজিবুর রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্থানীয় আলিয়া মাদ্রাসা, নওয়াপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে নামাজ আদায় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। নওয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা জোবায়ের হোসেন বলেন, “অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা ডুবে যায়। অনেক ড্রেন নির্মাণের কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙে গেছে। কোথাও আবার ড্রেনের উচ্চতা ও ঢাল ঠিক না থাকায় পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।” বুইকরা গ্রামের ইদ্রিস আলী বলেন, “প্রতিবছর একই দুর্ভোগ। বাড়ি থেকে বের হতে হাঁটুপানি ভাঙতে হয়।
কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও আমাদের কষ্ট কমেনি।” জলাবদ্ধতার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে নওয়াপাড়া পৌর প্রকৌশলী অসীম কুমার সোম বলেন, “শুধু ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে দায়ী করা ঠিক হবে না। অনেক ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে ড্রেনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন। এছাড়া পৌরসভার অধিকাংশ পানি ইউনিয়ন এলাকার মধ্য দিয়ে নিষ্কাশিত হয়। অপরিকল্পিত ঘের ব্যবস্থাপনার কারণেও পানি বের হতে পারছে না।” তবে নওয়াপাড়া পৌর প্রশাসক শেখ সালাউদ্দিন দিপু বলেন, “পৌরসভার অনেক ড্রেন দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা ও অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। এ কারণে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। পানি দ্রুত সরাতে পৌরসভার একাধিক টিম কাজ করছে।” তবে স্থানীয়দের দাবি, সাময়িকভাবে পানি সরিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। তারা ড্রেনেজ প্রকল্পে ব্যয় হওয়া অর্থ, নির্মাণকাজের মান, পরিকল্পনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, পরিকল্পনার ঘাটতি, নির্মাণত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব—সব মিলিয়েই নওয়াপাড়া প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার স্থায়ী দুর্ভোগে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নতুন ড্রেন নির্মাণ করলেই হবে না; পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, দখল ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন ছাড়া নওয়াপাড়ার জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
