সৈকত হোসেন
নববর্ষ বরণে যশোর চারুপীঠসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা প্রস্তুতি নিয়েছে। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কেউ কাগজ কেটে বৈশাখ বরণের সাথে সামঞ্জস্য ফুল-ফল আঁকছেন। কেউ আবার প্যাঁচাসহ নানা পাখপাখালির গড়ছে খড়-মাটি দিয়ে। নানা আকৃতি ও ধরনের মুখোশে দেওয়া হচ্ছে রং-তুলির পরশ। এখন পর্যন্ত যশোরে ৩২টি সংগঠনের প্রস্তুতি গ্রহণের তথ্য পাওয়া গেছে।
যশোরসহ দক্ষিণাঞ্চলে বাংলা নববর্ষ বরণের শোভাযাত্রার আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত যশোরের চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট। যার হাত ধরে দেশে নববর্ষের শোভাযাত্রার সূচনা হয়েছিল, সেই মাহবুব জামিল শামীমের নেতৃত্বে চারুপীঠে শুরু হয়েছে বাংলা ১৪৩২ সালকে বরণের শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করছেন শিল্পীরা। তৈরি করছেন নানা উপকরণ। চার দশক পেরিয়ে পাঁচ দশকে পদার্পণ করা শোভাযাত্রার এবারের প্রতিপাদ্য ‘যতনে রাখি ধরণীরে’। বাংলাদেশের বর্ষবরণের শোভাযাত্রা এখন জাতিসংঘের ইউনেসকো স্বীকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। এর সূচনা হয়েছিল ১৯৮৫ সালে চারুপীঠ যশোর থেকে। শুরুর বছরে এর নাম ছিল আনন্দ শোভাযাত্রা। উদ্যোক্তা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে সদ্য পাস করা শামীম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বন্ধু শিল্পী হীরন্ময় চন্দ্রসহ আরও কয়েকজন। প্রথম বছরই আনন্দ শোভাযাত্রায় যশোরবাসীর অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এমন সাড়া ফেলেছিল যে তা আর চারুপীঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ঠিক পরের বছরই এখানে সম্মিলিতভাবে মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে তা পালিত হয়। এর জন্য যাবতীয় উপকরণ তৈরি করেছিলেন চারুপীঠ যশোরের শিল্পীরা। দলমত-নির্বিশেষে সব পর্যায়ের মানুষ এ আয়োজনে যুক্ত হয়েছিলেন। যশোরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তা সৃষ্টি করেছিল এক নতুন মহাকাব্য। একুশের প্রভাতফেরি থেকে শোভাযাত্রার চিন্তা মাথায় আসে জানিয়ে শিল্পী শামীম বলেন, ‘তারুণ্যের রক্তে গড়া একুশের পথ ধরে আমাদের ভাষা, স্বাধীনতা। যাতে আছে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবার মিলন। এই একুশের প্রভাতফেরিকেই যেন ফেলে আসা সব শিল্প-ঐতিহ্যের সম্ভারে সাজিয়ে এ উৎসব রচনা করা হয়েছিল।’ এবারের আয়োজন নিয়ে শামীম জানান, শোভাযাত্রায় সব সৃজনশীলতা একসঙ্গে জ্বলে উঠবে। এখানে ঘটবে নাচ, গান, নাটক, যাত্রাসহ বাঙালি সংস্কৃতির সব ধারার সম্মিলন। নদীতে জেলের মাছধরা, বাউলিয়ানা, জারি, সারি, ভাটিয়ালিতে মাতোয়ারা হয়ে পরিবেশের প্রতি ভালোবাসা তুলে ধরবেন অংশগ্রহণকারীরা। একটি বিশাল দৃশ্যমান ক্যানভাসে সবকিছু জীবন্ত ফুটিয়ে তোলার জন্য কর্মযজ্ঞ চলছে। শোভাযাত্রাটি যখন রাস্তায় বের হবে, তখনই আসলে বোঝা যাবে যে কী হয়েছে। চারুপীঠের সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদের তথ্য অনুযায়ী, বিধ্বংসী নানা কর্মকাণ্ড থেকে পরিবেশ, প্রতিবেশ আর প্রাণিকুলকে রক্ষায় সচেতনতার বার্তা তুলে ধরা হবে যশোরের শোভাযাত্রায়। যেখানে থাকবে বন, বনের প্রাণী, পাহাড়, নদী ইত্যাদি। অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের মতো সেজে হইহুল্লোড় করে, নেচে-গেয়ে পুরো আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তুলবেন। শুরুর ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে দলমত-নির্বিশেষে যশোরের সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেবেন। পুরো আয়োজনকে সার্থক করতে ৩২টি সাংস্কৃতিক সংগঠন, বাউলশিল্পীরা থাকবেন। অংশগ্রহণকারীদের মাথায় থাকবে পাতা দিয়ে তৈরি করা টুপি। শুধু চারুপীঠ নয়, বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত যশোরের ৩২টির বেশি সংগঠন নিয়েছে নানা প্রস্তুতি। উদীচী, বিবর্তন, ব্যঞ্জন যশোর, তির্যক যশোর, পুনশ্চ, চাঁদের হাট, উৎকর্ষ, স্পন্দন, সপ্তসুর, সুরধনী, সুরবিতান, নিত্যবিতানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনে চলছে গান, নাচ, নাটক ও গীতিনাট্যের মহড়া। যশোরের সংস্কৃতিকর্মীরা সব শঙ্কা কাটিয়ে উৎসবের আমেজে নববর্ষ বরণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে কয়েকজন জানান, পৌর উদ্যান, মুসলিম একাডেমি, আব্দুর রাজ্জাক কলেজ, নবকিশলয় মাঠ এখন পর্যন্ত নিষ্কণ্টক থাকলেও শহরের প্রাণকেন্দ্র টাউন হল ময়দান রয়েছে বাণিজ্য মেলার দখলে। ফলে পুনশ্চর বর্ষবিদায় ও সুরবিতানের বর্ষবরণ আয়োজনে ঘটতে যাচ্ছে ছন্দপতন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি দীপংকর দাস রতন জানান, বৈশ্বিক মহামারি করোণার কারণে ১৪২৭ ও ১৪২৮ সালের নববর্ষের উৎসব ছিল ঘরবন্দী। ১৪২৯ ও ১৪৩০ সালে রমজান মাসে অনেকটা কাটছাঁট করে উৎসবে মেতেছিল যশোরবাসী। পরের বছর সন্ধ্যার আগেই শেষ করতে হয়েছে বৈশাখের আয়োজন। এবার সবকিছু স্বাভাবিক থাকায় সাড়ম্বরে ঢাকঢোলের বাদ্যে মেতে উঠতে প্রস্তুত হচ্ছে সংগঠনগুলো। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খাঁন বিপ্লব জানান-বরাবরের মতো এবারও পৌর উদ্যানে উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। সকালে ও বিকেলে দুই দফায় সংগঠনটির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকবে। তবে দেশের প্রাচীনতম সুরবিতান সংগীত একাডেমি পড়েছে বেকায়দায়। শহরের প্রাণকেন্দ্র টাউন হল ময়দানের বটবৃক্ষ তলে সংগঠনটির বিশাল আয়োজন থাকলেও এবার বাণিজ্য মেলা বাধ সেধেছে। এর মাঝেও প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে সংগঠনটি। সাধারণ সম্পাদক বাসুদেব বিশ্বাস জানান, উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। পয়লা বৈশাখে একাডেমি কার্যালয়ে সবার জন্য মিষ্টিমুখের ব্যবস্থা থাকবে। নিরাপত্তার বিষয়ে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নূর ই আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘বাঙালির এই বর্ণিল উৎসবে নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি থাকবে না। পর্যাপ্ত টিম কাজ করবে শহর ও অনুষ্ঠানস্থলে।’ এদিকে, বর্ষবরণ নিয়ে প্রতিবছর নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে পরিস্থিতি আরও প্রকট হয়েছে। এসব বিবেচনায় মঙ্গল শোত্রার নাম বদল করা হয়েছে। যদিও এটিকে বদল নয়, পুনরুদ্ধার বলা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম বলেছেন, বর্ষবরণ নিয়ে প্রতি বছর নানা জনের নানান কথা বা বিতর্ক তৈরি হয়। তিনি বলেন, বর্ষবরণ উৎসবের নাম পরিবর্তন নয়, আমরা পুনরুদ্ধার করেছি। শুক্রবার (১১ এপ্রিল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। ১৯৮৯ সালে প্রথম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই বর্ষবরণ উৎসব শুরু হয়। পরে ১৯৯৫ সালে এটি আনন্দ শোভাযাত্রা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা নাম পায়। নতুন নাম দেওয়া হয়েছে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা। অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম বলেন, ১৯৮৯ সালে বর্ষবরণ উৎসবের এই চর্চা শুরু হয়। আমরা তখন এখানকার ছাত্র ছিলাম। পরে ‘মঙ্গল’ শোভাযাত্রা হিসেবে নাম পরিবর্তন হয়। তিনি বলেন, ১৯৮৯ সালের আয়োজনে স্বতস্ফূর্ততা কতটা ছিল, আর পরে কী হয়েছে, তা আপনারা জানেন। সে কারণে আমরা এটিকে পরিবর্তন বলছি না, আমরা বলছি পুনরুদ্ধার। কোনো পক্ষের চাপে তারা এটি করেছেন কি না জানতে চাইলে ডিন বলেন, চাপের প্রসঙ্গটা আমরা ওভাবে মূল্যায়ন করতে চাই না। প্রতি বছর বর্ষবরণ নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়। আমাদের এই ভূখণ্ডের প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার মানুষ কীসের মধ্যে দাঁড়াবে, সে জায়গাটা আসলে বিবেচ্য। তিনি বলেন, মঙ্গল শব্দের কোনো শব্দগত ত্রুটি আমি দেখছি না। তবে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা শব্দটিকে এমনভাবে ব্যবহার করেছে যে সমাজের মধ্যে এ নিয়ে একটি বাজে অনুভূতি কাজ করছে। আমরা অতীতে ফিরে যেতে চাই, যেখানে সবার স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল, যেখানে সংস্কৃতির মধ্যে কোনো রাজনৈতিক আগ্রাসন ছিল না। সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুন আহমেদ, অধ্যাপক এ এ এম কাওসার হাসান, প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদসহ বর্ষবরণ উদযাপন সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি এবং বিভিন্ন উপ-কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

