৩রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ১৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

এনবিআরে দীর্ঘ সংকট

দেশের অর্থনীতি এক কঠিন সময় পার করছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা চলছে। টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি ঘাটতি, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদহার, কঠোর মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ নানা কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উদ্যোক্তারা হতাশা ও আস্থাহীনতায় ভুগছেন।এর ফলে বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। কর্মসংস্থানেও স্থবিরতা নেমে এসেছে। দেশের অর্থনীতি রীতিমতো ধুঁকছে। এমন পরিস্থিতিতে মাসাধিককাল ধরে রাজস্বকর্মীদের আন্দোলন চলছে।কলমবিরতি, মিটিং-মিছিলের পর গত শনিবার শুরু হয় শাটডাউন কর্মসূচি। এর ফলে আরো অচল হয়ে পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য। বন্দরগুলোতে আমদানি করা পণ্য খালাস ব্যাহত হয়। রপ্তানিমুখী পণ্য জাহাজে তোলা বন্ধ হয়ে যায়।পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আওতাধীন সব শ্রেণির চাকরিকে অত্যাবশ্যকীয় ঘোষণা করে। সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে না ফিরলে দেশের ‘জনগণ ও অর্থনীতির সুরক্ষায়’ সরকার কঠোর হতে বাধ্য হবে।
দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা এবং তাঁদের সংগঠনগুলো এই অচলাবস্থা নিরসনের জন্য উপর্যুপরি তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে। গতকালও অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। তাঁরা অবিলম্বে এই সমস্যার সমাধান চাইছেন।
তাঁদের মতে, রাজস্বকর্মীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউনে’ দিনে অন্তত আড়াই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এটি যত দীর্ঘায়িত হবে, ক্ষতির অঙ্ক ততটাই বাড়তে থাকবে। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে রাজস্বকর্মীদের প্রতিও দেশের স্বার্থে কাজে ফিরে যাওয়ার আহবান জানানো হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর বিভক্তির প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হলেও পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় সংস্থার বর্তমান চেয়ারম্যানকে অপসারণের দাবি। আগের কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় শনিবার থেকে শুরু হয় কমপ্লিট শাটডাউন। এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ব্যানারে সারা দেশে সংস্থার সব কাস্টম হাউস, ভ্যাট কমিশনারেট ও আয়কর অফিসে কর্মবিরতি পালন করা হয়। এর ফলে গ্রাহকরা যেমন সেবা নিতে পারেননি, তেমনি চরম ভোগান্তিতে পড়েন ব্যবসায়ীরা।
চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি রেকর্ড পর্যায়ে। আশা করা হয়েছিল, অর্থবছরের শেষ দুই মাসে রাজস্ব ঘাটতি অনেকটাই কমিয়ে আনা যাবে। বাস্তবে তা হয়নি। অর্থনীতিবিদরা একে অর্থনীতির জন্য একটি অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, অনেক আগেই এই সমস্যাটির সমাধান হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘এই শাটডাউন অর্থনীতির জন্য ব্যাপক ক্ষতিকর। এটা আমাদের অর্থনীতির শ্বাসনালিকে চেপে ধরার মতো। কারণ বাণিজ্য না হলে কারখানায় উৎপাদন হবে না, খামারে চাষ হবে না, এমনকি দোকানে পণ্য আসবে না। এনবিআর কাজ না করলে জাহাজে মাল ওঠানো যাবে না। আর নামালে সেটা বন্দরে পড়ে থাকবে, খালাস করতে পারবেন না। তাহলে অর্থনীতি চলবে কিভাবে?’ বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যাপারটা অনেক দূর গড়িয়েছে, অনেক জটিল হয়েছে। এখন আর দেরি না করে প্রধান উপদেষ্টা বা অর্থ উপদেষ্টার একটা নিরপেক্ষ জায়গা থেকে যেটা সবচেয়ে ভালো সমাধান সেটা আলোচনার মাধ্যমে করা উচিত।’ অবশেষে রাতের বেলা শাটডাউন কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়।
অর্থনীতি বিপর্যস্ত হলে দেশের মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হবে। কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাবে। দেশে ও সমাজে এক বহুমুখী সংকট তৈরি হবে। তাই দ্রুততম সময়ে এই সমস্যার কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান হওয়া প্রয়োজন।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়